বেঙ্গল লাইভ Special

সফল মা-বাবা হতে চান ? মাত্র এই কয়েকটি আচরণ করুন সন্তানের সঙ্গে

Bengal Live স্পেশালঃ  আজকের বাবা- মা, আমরা, সন্তানদের ভালো করতে গিয়ে আসলে তাদের খারাপ করে ফেলছি না তো?একটু ভাবুন। লিখেছেন অমিতাভ দাষ। 

 

রেশম খুব শান্তশিষ্ট মেয়ে। এই ফেব্রুয়ারিতে তার ছয় বছর হল। তার বাবা আমার বিশেষ বন্ধু ও দাদা । কাজেই তার বাড়িতে যাওয়া আসা আছে। সেদিন রেশমের মা আমায় এক অদ্ভুত অভিযোগ জানালো। রেশম নাকি খুব ভীতু। তার দিদিমণি একটু বকলেই সে কাঁদে, যখন তখন কেঁদে ফেলে। আরশোলা বা টিকটিকি দেখলেও চিৎকার করে। বাড়িতে থাকলে জোরে জোরে গান করে। তাছাড়া তার নাকি পড়াশোনায় বিশেষ মনোযোগ নেই। হাতের লেখা ভালো নয়। ওর মা তার নিজের হাতের লেখা আর রেশমের বাবার হাতের লেখা নিয়ে এসে আমায় দেখালেন, তারপর দেখালেন রেশমের লেখা। তিনি মেয়ের বাজে হাতের লেখার জন্য বিশেষ লজ্জিত,বোঝা গেল। তাছাড়াও আমাকে রেশম সম্পর্কে প্রায় দশ- বারো রকমের অভিযোগ শুনতে হল। তারপর আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, ”যে ভাবী, এবার আমাকে রেশম সম্পর্কে দুটো ভালো কথা বলুন তো!” উনি ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেলেন। যেন কোনো মজা করে ফেলেছি।

কতটা ছুঁলে যৌনতা ? বোম্বে হাইকোর্টের রায়ের পরে উঠছে এই প্রশ্ন

আসলে আমরা আমাদের সন্তানদের ভালো করে চিনতেই পারি না অনেক সময়।কখনো তাদের তুলনা পাশের বাড়ির পড়াশোনায় ভালো বাচ্চার সঙ্গে করি, তো কখনো অন্য আত্মীয়ের অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে, হোক না তুলনায় সে বয়সে অনেক বড়। আসলে প্রত্যেকটি মানুষ যে স্বতন্ত্র সত্তা, তা আমরা ভুলে যাই। তা ছাড়াও আমরা বাচ্চাদের আবেগ বা উৎসাহকেও কখনো খুব কম, আবার কখনো খুব বেশি প্রাধান্য দিয়ে ফেলি। কখনো তাদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ করতে বাধা দেই, কখনো বা রেগে যাই, তারা বড়দের মতো আবেগ প্রকাশ করছে না বলে।যেমন ,হয়তো একটি শিশু পরীক্ষায় খুব খারাপ ফল করলো, কিন্তু সে দেখা যাচ্ছে, তাতে মোটেও দুঃখ পায়নি। আমরা বড়রা তাকে ভীষণ কড়া শাসন করতে থাকি। আবার দেখা গেলো, সেই বাচ্চাটিই কোথাও পড়ে গেছে,তাই কাঁদছে। আমরাই বলে উঠি, এতে এত কাঁদার কী আছে ! তার মানে আমরাই আবেগের বহিঃপ্রকাশে বাধা দিচ্ছি। এটা কি দ্বিমুখীতা নয় ? একটু ভাবুন তো !

  • আবেগ প্রকাশে বাধা দেবেন নাঃ 

আমাদের শরীরের যতগুলি Self defence mechanism রয়েছে, আবেগের বহিঃপ্রকাশ তার অন্যতম। সন্তানকে তার আবেগ প্রকাশে বাধা দেবেন না। তার কোথাও কাটলে বা লাগলে, যদি সে কাঁদে, তাকে বোকা ছেলে, বোকা মেয়ে ,এসব বলবেন না। শান্ত করুন, কিন্তু কখনোই বলবেন না যে, কান্না একটা সাধারণ ব্যাপার নয়। তাকে বোঝান, যে সাবধানে দেখেশুনে চলাফেরা না করলে, তার লাগতেই পারে। সে একটু কেঁদে নিলে তার মানসিকভাবে ব্যথার অনুভূতি কমে যাবে, কিন্তু আসল ব্যথা কমবে না।তার জন্য পরিচর্যা দরকার। কোনো বয়সেই কখনোই সন্তানকে “কাঁদিস না” একথা বলবেন না। সুস্থ থাকতে হলে কান্নার দরকার আছে বৈকি। বাচ্চারা কাঁদে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। আর বড়রা কাঁদে মানসিকভাবে হাল্কা হওয়ার জন্য।

এই কয়টি গুণ রপ্ত করতে পারলেই সন্তানের মানুষ হওয়ার পথ অপ্রতিরোধ্

একইরকমভাবে মানুষের হাসিও তার আবেগের বহিঃপ্ৰকাশ। কেউ শব্দ করে হাসে মানেই যে, লোকে তাকে খারাপ বলবে, এই ধারণাও ভুল।বাবা-মারা ছেলে বা মেয়েকে শাসন করে, ওভাবে হাসবি না, দাঁতের মাড়ি দেখা যায়, বা তুই কথায় কথায় হাসিস কেন! অথবা সবাইকে দেখে অত হাসার কী আছে ? এই রকমভাবে আসলে আমরা আমাদের সন্তানের অভ্যন্তরীণ মানসিক আত্মবিশ্বাসে ভীষণভাবে ক্ষতি করে ফেলি। কোন ছেলেটা দুঃখে কতটা কাঁদবে বা কোন মেয়েটি কিভাবে হাসবে সেটাও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। সমাজ পাল্টাচ্ছে।তাই মানসিকতাও পাল্টাতে হবে বৈকি।

  • ব্যর্থতার গুরুত্ব বোঝানঃ 

আমরা সবসময় সন্তানদের সফলতার গুরুত্ব বোঝাই। এমন ভুল আর করবেন না। সন্তানকে ব্যর্থতার গুরুত্ব বোঝান। বোঝান যে জীবনে চলার পথে সফলতা আর ব্যর্থতা পাশাপাশি চলতে থাকে। কোনটার সঙ্গে তোমার দেখা কখন হবে, সেটা সবসময় তোমার উপরেও নির্ভর করে না।( ব্রিটিশ কবি রুডইয়ার্ড কিপলিং এর “IF” কবিতাটা পড়তে পারেন)
কাজেই জীবনের কোনো একটা বা দুটো ব্যর্থতায় সম্পূর্ণ জীবনের গুরুত্ব কমে যায় না। আপনার সন্তানকে গল্প বলুন মাইকেল ফ্যারাডে ইলেকট্রিক বাল্ব আবিষ্কার করার আগে কতবার সেই প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছিল, অথবা হাঁটা শেখার আগে সে কতমাস ধরে টলোমলো পায়ে পড়ে যেত। এভাবে তাকে জীবনের সবচেয়ে দামি শিক্ষা দিতে থাকুন। যাতে চলার পথে ব্যর্থতা তার কাছে একটি সাধারণ ঘটনা মাত্র হয়ে দাঁড়ায়, যাতে কোনো সফলতাই তার মাথা না ঘুরিয়ে দেয়, যাতে সে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারে।

Internet : তথ্যের জালে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব, কীভাবে বাঁচাবেন ?

আপনিও চেষ্টা করুন সন্তানের ব্যর্থতায় তার পাশে দাঁড়াতে আর তার সফলতায় অতিরিক্ত উচ্ছাস নিয়ন্ত্রণ করতে। আসলে আমরা ঠিক তার উল্টোটাই করি কিনা!

  • আত্মনিয়ন্ত্রণ অভ্যাস করানঃ 

সন্তানকে আত্মনিয়ন্ত্রণ অভ্যাস করান।দেখা গেছে যেসব বাচ্চার আত্মনিয়ন্ত্রণ বেশি,তারা জীবনে সফলতা বেশি পায়।কারণ তারা ছোটখাট লক্ষ্য (short-term goal) আর বড় লক্ষ্য (long- term goal) এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সেই লক্ষ্যগুলি অর্জন করতে সচেষ্ট হয়।

সেজন্য সন্তান যখনই কিছু চাইছে, সঙ্গে সঙ্গে দেবেন না। সেই জিনিসটির গুরুত্ব তাকে বুঝতে দিন। তাকে ভবিষ্যতের কোনো সময় বলে দিন,যেদিন আপনি তাকে ওই জিনিসটি দেবেন।তাই বলে সব সময় জিনিস দেবেন বলে,শর্ত বেঁধে দেবেন,এমনটা করবেন না। আসলে হাতের নাগালে সবসময় সবকিছু পেয়ে যেতে থাকলে বাচ্চারা জিনিসের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেনা। পরবর্তী জীবনেও তারা এমন এমন অবিশ্বাস্য লক্ষ্য স্থির করতে থাকে, যেগুলোতে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। তার ফলে মানসিক সমস্যা হতে পারে।

ইমোজির মানে না বুঝে ব্যবহার ? সাবধান ! ইমোজির পেছনে যৌনতার ব্যঞ্জনা

ছোট ছোট লক্ষ্যের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ অভ্যাস করলে সন্তান পরবর্তী জীবনে ডিসিপ্লিন্ড ও বাস্তবচিত লক্ষ্য স্থির করতে পারে।তার জীবন সুখের হয়।

  • সন্তানকে কি ফার্স্ট হতেই হবেঃ

সব পিতামাতার এটাই একমাত্র কামনা। কিন্তু বাচ্চার মধ্যে প্রথম হবার নেশা ঢুকিয়ে দিলে কিন্তু আখেরে আপনার সন্তানেরই ক্ষতি হতে পারে, আর সেই ক্ষতি এমনভাবে জীবনে আসতে পারে ,যে তা পূরণ করা সম্ভব নয়। শ্রীকৃষ্ণ তার ভগবদ্গীতায় বলেছেন যে মানুষের অধিকার তার কর্মে,ফলে নয়, কারণ ফল একটা আপেক্ষিক ও অনেক বিষয়ের উপর নির্ভরশীল ব্যাপার। যে পড়াশুনা করে বা পরিশ্রম করে আপনার সন্তান তৃতীয় হয়েছে,তার থেকে অনেক কম পরিশ্রম করেও অন্য কেউ প্রথম হয়ে যেতে পারে, কারণ সে হয়ত অনেক প্রশ্ন ভাগ্যক্রমে কমন পেয়ে গেছে। এতে কিন্তু আপনার সন্তানের কৃতিত্ব কমে যায় না, কারণ সে কিন্তু তার সেরাটাই দিয়েছিল।তাই তাকে উৎসাহিত করুন,তার সেরাটা সবসময় দিতে, কিন্তু প্রথম হওয়ার জেদ তার মধ্যে ঢোকাবেন না। এতে প্রথম না হলে সে ভেঙে পড়বে,পরবর্তী প্রস্তুতি সে নিতে পারবে না। ভবিষ্যৎ জীবনে যদি এরকম হয়,তাহলে জীবনের পরীক্ষায় সে বারবার প্রথম হতে চাইবে,আর কখনো তা না হলে,সে নিজেকে গুরুত্বহীন ভাবতে শুরু করবে।

 

  • কড়া বাবা-মা না নরমঃ

যেসব বাবা-মা নিজেদের জীবনে ডিসিপ্লিন্ড, তাদের বড়দের মেনে চলেছেন,তাদের সন্তানরাও সে গুনটি পরিবেশগতভাবেই পেয়ে যায়। দেখা গেছে সাধারণত কোনো পরিবারে মা কড়া হলে,সন্তানরা গোছানো ও নিয়মানুবর্তী হয়।সন্তানের বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত বাবা-মা একসঙ্গে নেবেন,যাতে সন্তানের সামনে কোনো সিদ্ধান্ত আলাদা না হয়।সন্তানকে কোনো কথা দিলে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন, তাতে আপনার প্রতি তার ভরসা ও বিশ্বাস যেমন বাড়বে, সে নিজেও সেরকমই তৈরি হতে শিখবে।যদি তাদের রাতে খাবার সময় 9টা হবে ঠিক করেন,দেখবেন যেন সেটার হেরফের তারাও কখনোই না করে।অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট পথ,নিয়ম তাদের জন্য যাতে থাকে।এতে তারাও মানসিকভাবে শক্তিশালী হবে। তবে বিশেষ বিশেষ দিনে এইসব নিয়মকানুনেরও ছাড় থাকবে নিশ্চয়ই।

বন্ধু-বান্ধবী ও যৌনতা নিয়ে শিশুর মনের কৌতুহল কীভাবে সামলাবেন বাবা-মা ?

সন্তানরা বড় হলে পারিবারিক সিদ্ধান্তগুলো একসাথে বসে করবেন।তাদের মতামত নেবেন,কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে আপনার।এতে তারা তাদের সমস্যা আলোচনার করার মত পরিবেশ বাড়ি থেকেই পাবে।সমস্যা লুকাবে না।
আবার সন্তানের সাথে বন্ধুর মতও মিশতে হবে।তার প্রথম ধাপ,সে যখন কথা বলবে,তার দিকে তাকিয়ে তার কথা শুনুন,তাকে বাচ্চা বলে গুরুত্ব দিচ্ছেন না,এমনটা সে মনে করতে থাকলে বড় হযেও তার প্রভাব থেকে যাবে।বন্ধুরা খুব প্রিয় হয়,কারণ বন্ধুরা সব কথা শোনে।তাই আপনি যে আপনার সন্তানের সবচেয়ে বড় বন্ধু ও গাইড,এটা তাকে বারবার বোঝান।দেখবেন আপনাদের সম্পর্কের মধ্যে একটা খুব সুন্দর ভারসাম্য থাকবে।

  • ভালো পিতা- মাতাঃ

ভালো পিতা ও মাতা তারাই যারা বাস্তববাদী ও সন্তানকেও সেরকমভাবেই মানুষ করেন।তারা সন্তানের আরাম- আয়েশের থেকে বেশি গুরুত্ব দেন তাদের বাস্তব প্রয়োজনকে। সন্তান হয়ত দোকানের খাবার খেতে চাইল,আপনি বললেন, যে চলো,”ওই খাবারটাই আজ বাড়িতে বানাবো, কারণ দোকানের খাবার পুষ্টিকর নয়।“, এতে যেমন আপনি আপনার সন্তানের সাথে সময় কাটালেন,সেও একটা নতুন জিনিস বানাতে শিখল।তেমনভাবেই সন্তানের জন্মদিনে তাকে খুব দামী খেলনা না দিয়ে পাশের বস্তির কয়েকটি ছেলেমেয়েকে মিষ্টি, খাতা বা রংপেন্সিল কিনে আপনার সন্তানকে দিয়ে বিতরণ করুন। বুঝতে পারবেন সে কতটা আনন্দ পাচ্ছে। দেখবেন সে ছোটবেলা থেকে দয়া, মায়া,মমতা এসব বুঝতে পারলে শেষ বয়সে আপনারই লাভ হবে।

এভাবেও ভাল থাকা যায় ! মানুন, না মানুন, অসুখী মধ্যবিত্তরা পড়ে দেখুন

অতিরিক্ত আরাম,অতিরিক্ত নির্ভরতা ,অতিরিক্ত চাহিদাপুরণ আপনার সন্তানকে অলস,অকর্মন্য,বোধশক্তিহীন বানাতে পারে।আবার অতিরিক্ত শাসনও মানুষকে হিংস্র, অন্যের প্রতি অনুভূতিহীন বানিয়ে দিতে পারে। পশুৱা যেমন শুধুমাত্র নিজের সুখ-সুবিধাটুকু বোঝে,মানুষ তো তেমন নয়।বর্তমান মানবসমাজে কখনো কখনো মানুষ ও পশুর পার্থক্য গুলিয়ে যায়।সন্তানকে ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি অফিসার এসব বানানোর আগে মানুষ তৈরি করুন।কারণ এই পৃথিবীতে সত্যিকারের মানুষের মূল্য সবদিনই সবচেয়ে বেশি।এর বিকল্প কখনো হয়নি,হবেও না।

 

লেখক: অমিতাভ দাষ।
Child and adolescent Counselor.
Psychotherapist
Mob: 7001596757

Related News

Leave a Reply

Back to top button