বেঙ্গল লাইভ Special

এই কয়টি গুণ রপ্ত করতে পারলেই সন্তানের মানুষ হওয়ার পথ অপ্রতিরোধ্

Bengal Live স্পেশালঃ

  •  আপনি কি আপনার সন্তান অন্যদের মতো নয় বলে চিন্তিত?
  •  সন্তানকে কি আপনি নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চান?
  •  ওজন কি শুধু শরীরেরই হয়, মনের কিংবা তথ্যের ওজন থেকে আপনার শিশুকে রক্ষা করবেন কিভাবে?

 

 কিভাবে তৈরি করবেন সন্তানের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিবেশ। লিখছেন অমিতাভ দাষ।
পড়তে থাকুন। আজ তৃতীয় কিস্তি।

ADVERTISEMENT
  •  কন্যাদায়ঃ 

    আমার মেয়ের বয়স সাত। অন্য বাচ্চাদের মতো তারও স্কুল বন্ধ। ফলে স্ক্রিন টাইম (যতখানি সময় বাচ্চারা মোবাইল ও টিভি দেখে ব্যয় করে) অনেক বেড়ে গেছে। তার জেদ বেড়েছে,রাগ বেড়েছে,বেড়েছে কান্নাকাটির বহর,অভিমানের রকমফের। যতই বাচ্চাদের মনস্তত্ব নিয়ে পড়াশোনা করি, সবক্ষেত্রেই বিদ্যা ফলানোর চেষ্টা না করাই ভালো ।তাই আমি সবসময় চেষ্টা করি,ভালো বাবা হবার জন্য। প্রতিদিন অল্পের জন্য হেরে যাই,কিন্তু হার মানি না। পরেরদিন আবার চেষ্টা শুরু করি।বেশ কঠিন এই কাজ। রেগে গেলে ধমকে দিচ্ছি,সেও অভিমান করে গিয়ে সিঁড়ি তে বসে পড়ছে। কিছুক্ষণ পর আমিই গিয়ে তার অভিমান ভাঙাচ্ছি। সময় লাগছে,কিন্তু আমি বিরক্ত হচ্ছি না। তবে রাগ ভাঙাতে আমি কখনোই কোনো উপহারের সাহায্য নিইনি ,এটা মানতে হবে।

  •  সন্তানের জন্যঃ 

    আমরা চাই আমাদের সন্তান দশজনের একজন হোক। মানুষের মতো মানুষ হোক। তার জন্য সন্তানের পেছনে জলের মতো টাকা খরচা করতেও আমরা এতটুকু কার্পণ্য বোধ করি না। নাচ,গান,আঁকা,আবৃত্তি,ব্যাডমিন্টন, ক্যারাটে,আরো কত কী ! বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে ওই খুদের কাঁধে। লক ডাউনে মনে হয় এই চাপ বড়ই বেড়ে গেছে।আমরা চাইছি খুদেটিকে ব্যস্ত রাখতে,যে ভাবেই হোক,যেমন করেই হোক। বাবা -মায়ের দায়িত্ব যেন সংবিধানের মতো যতটুকু লেখা আছে,ততটুকুই।আমরাও খুবই ব্যস্ত।কখনো কাজে,কখনো বা অকাজে।তার ফলে খুদেটি কী ভাবছে,কেন ভাবছে,এসবের পেছনে সময় নষ্ট করা আমাদের বোকামি বলেও মনে হতে পারে।

কিন্তু একটি মানুষের ভবিষ্যৎ জীবন ও জীবনে সফলতা ও সেই সফলতাকে সঠিকভাবে বহন করার ক্ষমতা নির্ভর করে তার ছোটবেলার ভাবনাচিন্তার ওপর।এই ভাবনাচিন্তাগুলো আবার নির্ভর করে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ওপর।কাজেই সন্তানকে আমরা সঠিকভাবে বড় হবার উপযুক্ত পরিবেশ দিচ্ছি কিনা তা নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকতেই পারে।

  • কম্পাস এডভ্যান্টেজঃ 

    ড:মেরিলিন প্রাইস মিচেল, ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজিস্ট , প্রায় বত্রিশ বছর শিশু ও বয়ঃসন্ধিকালীন বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করছেন। তিনি লক্ষ্য করেছেন, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ জীবনে সফল হবার সম্ভাবনা ভীষণরকম বেড়ে যায় মাত্র আটটি কর্মক্ষমতা বা গুণের বিকাশ ঘটালে ,এগুলোই প্রধান দক্ষতা,যা অন্যান্য অনেক দক্ষতার মূল রূপে কাজ করে।তাই এগুলোকে core ability বলা হয়েছে। যে বাচ্চাদের এগুলি রয়েছে ,মেরিলিনের মতে তারা জীবন সমুদ্রে বারবার পথ হারালেও ঠিক অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যায়।তাই উনি এই দক্ষতা গুলিকে “The compass advantage” বলেছেন। এগুলি মেরিলিনের ভাষায়—

  •  Curiosity (কৌতূহল)
  •  Sociability (সামাজিক মেলামেশার দক্ষতা)
  •  Resilience ( হার না মানার ক্ষমতা)
  • Self-awareness ( নিজেকে বুঝতে পারা)
  •  Integrity (শক্তপোক্ত নৈতিকতার ভিত)
  •  Resourcefulness ( সমস্যা কাটিয়ে ওঠার উদ্যম)
  •  Creativity (সৃষ্টিশীলতা)
  •  Empathy ( সহমর্মিতা)

এই সবকটি গুণ কিন্তু শুধুই জিনগত সংরূপনের মাধ্যমে তৈরি হয় না।শিশু ছোটবেলা থেকে এই গুনগুলি পরিবেশ থেকে দেখে দেখে তার নিজের মধ্যে আয়ত্ত করে।
খুব সোজাভাবে বললে ব্যাপারটা এইরকম, আপনি আপনার সন্তানকে যতই দামি স্কুলে পড়ান,যতই ভালো গৃহশিক্ষক রেখে তার মেধা ও নম্বর বাড়ানোর চেষ্টা করুন,যতই তাকে বড় কিছু হবার স্বপ্ন দেখার কথা বলুন, সে যদি ওপরের গুণগুলো আয়ত্ত না করতে পারে; সে সফল হলেও সেই সফলতা ধরে রাখতে পারবে না।কারণ জীবন মানে শুধু বড় চাকরি,বড় ব্যবসা শুরু করা নয়, সেই সফলতাকে বহন করতে শেখা।আবার শুধু পার্থিব সফলতা,অর্থাৎ,টাকা-পয়সা,বাড়ি-গাড়ি এসবই তো শুধু সফলতা নয়। সফলতার আসল অর্থ নিজের শরীর-স্বাস্থ্য ও মন ভালো রেখে স্বচ্ছলভাবে বাঁচা।সমাজে দশজনের মধ্যে একজন হয়ে একজন ভালো মানুষ হবার উদাহরণ তৈরি করা। তা না হলে যতই টাকা-পয়সা একজন উপার্জন করুক না কেন;যদি কেউ মানসিক ও শারীরিকভাবে ভালো না থাকে, সেই অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার সে কোনোদিনও করতে পারবে না।

তাই সন্তানকে তার বেড়ে ওঠার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে বাবা-মা কেই এগিয়ে আসতে হবে।বসতে হবে পাশাপাশি আলোচনায়।সন্তানের জন্য করতে হবে short-term plan বা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা এবং long-term plan বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। পরিকল্পনা গুলির অভিমুখ হবে তিনটি।

প্রথমতঃ  তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ সংক্রান্ত।

দ্বিতীয়তঃ  তার পড়াশোনা ও শিখন সংক্রান্ত।

তৃতীয়তঃ  আর্থিক পরিকল্পনা।

  • সন্তানের বেড়ে ওঠার পরিবেশঃ 

    আপনার সন্তানকে বেড়ে ওঠার সঠিক পরিবেশ আপনি তখনই দিতে পারবেন যখন আপনি খোলা মনের মানুষ হবেন। আপনি যদি নিজে একজন গুটিয়ে থাকা,সামলে রাখা,ভয়ে-ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা মানুষ হন,যদি আপনি নিজেই স্বার্থ ছাড়া কারো সাথে না মেশা,সবাইকে সন্দেহ করা,পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষই খারাপ—এই রকম ভাবতে থাকা মানুষ হন, তবে আপনার সন্তানের জন্য যে মানসিক অন্ধকূপ আপনি তৈরি করে দিচ্ছেন,সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই।নিজেকে খোলা মনের মানুষ হিসেবে দেখুন,আত্মীয়-স্বজনদের বিপদে পাশে দাঁড়ান,মানুষকে আর্থিক ও শারীরিক ভাবে সাহায্য করুন।সন্তানকে সবার সাথে মিশতে শেখান। মাঠে খেলতে শেখান। তার কারো সাথে ঝগড়া হলে সেটা তার সাথে তাকে নিজেকে মিটমাট করতে শেখান।সবার সাথে কথা বলতে,সবার বিপদে সাহায্য করতে শেখান। আর আপনি যদি নিজেকে বদলাতে না পারেন,মানসিক থেরাপির সাহায্য নিন। যদি চান, সন্তান আপনার মুখ উজ্জ্বল করুক, তাহলে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করুন। কিছুই অসম্ভব নয়।সন্তানের জন্য এইটুকু করতে পারবেন না! নিশ্চয় পারবেন।

 

  • সন্তানের পড়াশোনাঃ 

সন্তানের মার্কশিট এর চেয়েও তার হাতের লেখার প্রতি মনোযোগ দিন। দেখুন আপনার সন্তান নিজে নিজে বই পড়ে বুঝতে পারে কিনা?নিজে নিজে সে ছবি আঁকছে কিনা?গান গাইছে কিনা? সে নিজের কোনো পছন্দের খাবার আপনাদের সাথে ভাগ করে খেতে চায় কিনা? কোনো কবিতার মানে সে নিজের মতো করে বলতে পারে কিনা?শুধু বই এর তথ্যভিত্তিক নয়, আপনার সন্তানের cognitive এবং metacognitive skills অৰ্থাৎ জ্ঞানভিত্তিক ও বোধভিত্তিক কুশলতার বিকাশ ঘটছে কিনা ,তার খেয়াল রাখুন। দরকার মনে হলে শিক্ষকদের সাহায্য নিন।আপনার সন্তান কোনো বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে পারছে কিনা, দেখুন। দেখুন তার বন্ধুবান্ধব আছে কিনা?সে কোন কোন ব্যাপারে বেশি উৎসাহী। পড়াশোনার বাইরেও অন্যান্য কুশলতার বিকাশ তার মধ্যে ঘটছে কিনা, খেয়াল রাখুন। সবাইকে যে শুধু পড়াশুনায় খুব ভালো হতে হবে,তার কোনো মানে নেই। কিন্তু ডিসিপ্লিন যেন থাকে। সন্তানের কেরিয়ার নিয়ে আপনার মতামত বা ইচ্ছে চাপাবেন না। আপনার সন্তান কী হতে চায়, সেটাও অতটা গুরুত্বপূর্ন নয়। সে কোনক্ষেত্রে ভালো, কোন কাজের ক্ষেত্রে তার বেশি সফল হবার সম্ভাবনা রয়েছে, তার জন্য বিভিন্ন কেরিয়ার টেস্ট রয়েছে, যেগুলি আপনার সন্তানের আট বছর বয়সের পর আপনি করাতে পারেন। সচেতন বাবা – মা নিশ্চয়ই সন্তানের ভবিষ্যৎ কেরিয়ার নিয়ে ঠিকঠাক পরিকল্পনা করে এগোবেন।
(এ বিষয়ে পরের কোনো এক সংখ্যায় বিশদ আলোচনা করা যাবে)

 

  • সন্তানের জন্য আর্থিক পরিকল্পনাঃ 

    সন্তানের জন্য প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট অর্থ জমা করুন। SIP(Systematic Investment Plan),সুকন্যা সমৃদ্ধি বা অন্যান্য যেকোনো ভাবেই আপনি রাখতে পারেন।কিন্তু সেটা পরিকল্পনা করে করুন। মেয়ে সন্তানের বিয়ের জন্য টাকা না জমিয়ে তার পড়াশোনায় খরচ করুন।এখন ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ভবিষ্যৎ বেশি উজ্জ্বল,অন্তত সিরিয়াস সন্তানদের।
    সন্তানের সারাবছরের একটা পড়াশুনার খরচা আছে,সেটাকে প্রতি বছরের প্রথমে হিসেব করে নিন। সেটা ছাড়াও আরেকটা long-term আর্থিক প্ল্যান করুন। তিনটি খাতে টাকা রাখতে পারেন। একটা যখন সন্তানের বয়স (15/ 16 ) পনের/ষোলো হবে, একটা যখন বয়স হবে উনিশ/কুড়ি (19/20) ,আর শেষেরটা তার বাইশ/তেইশ (22/23) বছর বয়সের জন্য।

  • শেষ কথাঃ 

সন্তানের জন্য চিন্তা করবেন,দুশ্চিন্তা করবেন না। সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করতে চাইলে মানবিক গুণগুলোর বিকাশ ঘটান তার মধ্যে।তাকে মানুষের মতো গড়ে তুলুন, রোবটের মত নয়।তাকে বড় হতে দিন ধীরে ,ধীরে।তার মধ্যে একাগ্রতা বৃদ্ধি করুন ,যাতে সে কোনো সাধারণ কাজকেও হালকাভাবে না নেয়।
আমি যখন এই লেখা লিখছি,বিকেল পাঁচটা বাজে। কিছুক্ষণ আগেই আমার মেয়েকে ডেকেছিলাম একটা বই পড়ে আমাকে শোনানোর জন্য।সে কার্টুন দেখছিল।পেপা পিগ।সে টিভি বন্ধ করে খুব ধীরে ধীরে কেটে পড়েছে অনেকক্ষণ আগেই।আমি পাশের ঘরে গিয়ে দেখি একটা কম্বল জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।অন্য দিন পাঁচটায় তার দিদিমনি আসে।আজ শনিবার ,তাই ছুটি।আমিও এই লেখা শেষ করে, তার কম্বলে ঢুকে তাকে জড়িয়ে একটুক্ষণ শুয়ে থাকবো।জানিনা আর কতটুকু সময় আমার কাছে আছে।জানিনা,কবে ,এই শীতটুকুও চলে যাবে। জানিনা,আর কতদিন পর সে বড় হয়ে যাবে।কিন্তু আজকের এই সময়টুকু খুব দামী।এই ঘুমটুকুর মধ্যে না জানি,সে কী কী হবার স্বপ্ন দেখছে। এ সময়, তার পাশে তো আমাকে থাকতেই হবে।তাই না!!

অমিতাভ দাষ।
(Child and adolescent counselor.)

Related News

Leave a Reply

Back to top button