বেঙ্গল লাইভ Special

সন্তানকে মনের মতো মানুষ করতে হলে এই কয়েকটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখুন

Join our WhatsApp group

শিশুর স্কুল যাওয়ার বয়স তার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই বয়স থেকেই তার একটি অন্য পরিচয় তৈরি হয়। কিভাবে তার শৈশব ধরে রাখবেন আপনার মনের মনিকোঠায় ? লিখেছেন শিশু মনস্তত্ত্ববিদ অমিতাভ দাষ। আজ দ্বিতীয় পর্ব।

ADVERTISEMENT

Bengal Live স্পেশালঃ দ্বিতীয় পর্ব

শিশুর নতুন স্কুলে: নতুন জীবন শুরুঃ

শিশুর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় আসলে তার স্কুল জীবন থেকেই। সে ঘরের চার দেয়াল ছেড়ে এবার পা দিচ্ছে বৃহত্তর আঙিনায়। তার সামাজিক হয়ে ওঠার হাতেখড়ি নতুন স্কুলে।আমাদের সমাজে আগে পাঁচ বা ছয় বছরের আগে বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানো হত না। কিন্তু এখন সময়ের সাথে সাথে শিশুদের স্কুলে যাবার বয়সেরও অগ্রগতি হয়েছে পশ্চাদপনে। বাড়ির বদলে এখন বাচ্চারা স্কুলেই শেখে A, B,C,D তিন থেকে চার বছর বয়সেই।

যেহেতু তার সামাজিক মেলামেশার, বন্ধু তৈরি করার সময় তার এই নতুন স্কুল পর্ব, তাই এই সময়টা ভীষণভাবে বাচ্চাদের আচার-আচরণের পরিবর্তন হয়। স্কুলে সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে বিভিন্ন পরিবারের শিশুরা আসে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের বাড়ির সংস্কার, ভাষার ও আচরণগত তারতম্য হয়। এটা শিশুর ক্ষেত্রে এজন্য ভাল, কারন সে বৈচিত্রকে স্বাভাবিক মনে গ্রহণ করতে সমর্থ হয়। নিউক্লিয়ার পরিবারে বাচ্চাদের মধ্যে যে আমিত্বের প্রাধান্য থাকে, তা স্কুলের পরিবেশে কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়। বাচ্চারা অন্যদের মত, অন্যদের চিন্তা ,ইচ্ছে যে সবসময় তাদের মনের মত হবে না, সেটা উপলব্ধি করতে পারে। সে হয়ে উঠতে থাকে একজন সামাজিক জীব।

স্কুল না যাওয়ার বায়নাঃ

প্রথম প্রথম দেখা যায় যে, বাচ্চারা কখনো কখনো স্কুলে যেতে চায় না। তাদের মনে হয় স্কুলের চার দেয়ালে যে নিয়মের ঘেরাটোপ রয়েছে, তা তারই জন্য। সে তো এতদিন স্বাধীনভাবে হামাগুড়ি দিয়েছে, এ ঘর -ও ঘর, দৌঁড়েছে উঠোনে, সিঁড়িতে উঠেছে। কখনো বকাও খেয়েছে বাবা-মার কাছে। কিন্তু এই ঘেরাটোপ তো অন্যরকম। এখানে চুপচাপ বসে থাকতে হয়, গল্প শুনতে ইচ্ছে না করলেও শুনতে হয়।মাকে ইচ্ছে করলেই দেখা যায় না। মা টিফিন খাইয়ে দেয় না ।যদি এখন পটি পায়, কি করব? এইসব চিন্তার জাল শিশুটি নিজের মধ্যে বুনতে থাকে। তারপর ভাবে স্কুল না গেলেই বেশি ভালো। সে ছোটবেলা থেকে বুঝেছে কাঁদলেই আমার দাবি সবাই মেনে নেবে, তাই সে কেঁদে ওঠে।বলে স্কুল যাবো না। কিন্তু তার এই কান্না অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রাহ্য হয় না। সেও ধীরে ধীরে বুঝে যায়, যে এই ব্যাপারে কান্না অর্থহীন। তারপর দ্যাখে তার বয়সী কত ছেলে-মেয়ে তো আসছে স্কুলে,কাঁদছে না। তখন সে চুপ করে যায়।

কখনো খুব সামান্য কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চাদের স্কুল যাবার ভীতি আতঙ্কে পরিণত হয়। সাধারণত নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির বাচ্চারা মা-বাবা ছাড়া কারো সাহচর্য খুব একটা পায় না। তাই কখনো কখনো সেপারেশন আনজাইটি ডিসঅর্ডার (Separation Anxiety Disorder) এর মত সমস্যা যাদের থাকে তাদের ক্ষেত্রে স্কুলে যাবার ক্ষেত্রে একটু বেশি সময় ধরে অসুবিধায় পড়তে হয়। কিন্তু এই সমস্যা সামান্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহনের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। বাবা-মায়েদের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো যে তারা সন্তানের ব্যাপারে অনেক সময়ই নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না। আপনার শিশুকে আজ হোক বা কাল, সমাজের অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশতেই হবে। তাই এ ব্যাপারে তার যত তাড়াতাড়ি স্কুলে যাবার ভীতি দূর করা যায়, সেটা তার পক্ষেই ভাল।

স্কুলে যাওয়ার সুফলঃ

অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, যে যারা নিজেরা খেতে পারত না, স্কুলে যাবার পরে এখন নিজেই খেতে শিখেছে,যেসব বাচ্চা দেরি করে কথা বলা শিখেছে, স্কুলে গিয়ে তাদের কথা বলার সমস্যা দূর হয়েছে, এমনকি তোতলামি (Stammering)ও কমে গেছে। এখন বেশিরভাগ দম্পতির একটিমাত্র সন্তান হবার ফলে স্কুলে যাবার গুরুত্ব আরো বেড়েছে। কারণ স্কুলেই এখন বাচ্চারা ভাগ করে খাওয়া, গল্প করা, কল্পনাপ্রবন হওয়া,খেলাধুলা করা ,এইসব শিখছে। তাছাড়াও স্কুলে বাচ্চাদের কাছে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, যেমন স্বাধীনতা দিবস, রাখিবন্ধন, বিদ্যাসাগরের জন্মদিবস ইত্যাদি পালিত হয় । শিশুরা এসবের গুরুত্ব বুঝতে পারে ,যার ফলে তার কাছে তার ব্যক্তিগত পরিচয়ের সাথে সাথে সামাজিক প্রেক্ষাপট উন্মুক্ত হয়। এটা ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরী। তাই লকডাউনে স্কুলের পড়া বাড়িতে হলেও স্কুলে যাবার গুরুত্ব কখনো কমবে না।

স্কুল থেকে খারাপ শিক্ষাঃ

বাবা-মারা অভিযোগ করেন বাচ্চারা স্কুল থেকে অনেক খারাপ কিছু শিখে আসে।তাদের কথা বলার ধরণ বদলে যায়।এমনকি শিশুরা মুখে মুখে তর্ক করতে শুরু করে।মিথ্যে কথাও বলে।এক্ষেত্রে কি করা সম্ভব?

তর্ক করার অভ্যাসঃ

মনে রাখবেন বাচ্চারা মুখে মুখে তর্ক করা কিন্তু স্কুল থেকে শেখে না।সাধারণত ছয় বছর পর থেকেই বাচ্চারা নিজের পছন্দ অপছন্দ বুঝতে শুরু করে।তারা ভাবতে শুরু করে তাদেরও আলাদা অস্তিত্ব আছে।সেগুলোকেই আমরা মুখে মুখে তর্ক বলে ভাবি।অনেক সময় বাড়ির পরিবেশেও সে প্রশ্ন করতে শেখে সেসব, যা সে মেনে নিতে পারেনা। তাকে বুঝিয়ে বলা উচিৎ কেন আপনি তাকে মানা করছেন।আপনার চিন্তার সঙ্গে তার চিন্তার পার্থক্য কোথায়? সে যাতে ভাবে তার পছন্দকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।আপনার বাচ্চা যখন বড় হবে ,তখন সে যদি কোনোকিছু না লুকিয়ে তার পছন্দ অপছন্দ নিয়ে সোজাসুজি আলোচনা করে, সেটাই ভালো নয় কি? তার রাস্তা এখন থেকেই তৈরি করুন।

মিথ্যে কথা বলাঃ

মিথ্যে কথা বাচ্চারা অনেক কারণে বলতে পারে।কখনো বিপদে পড়ার ভয়ে, কখনো মনের খেয়ালে(কল্পনা), কখনো অন্যদের প্রশংসা পাবার জন্য, কখনো বা কোনো পরিস্হিতির দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পাবার জন্য।সবক্ষেত্রেই তাকে মিথ্যে কথা থেকে বিরত করার চেষ্টা করবেন।সত্যি আর মিথ্যের পার্থক্য সে যাতে পরিষ্কার বুঝতে পারে,পরিবারে সেই চেষ্টা করবেন। বাচ্চাকে বোঝাবেন যে মিথ্যে কথা বললে তাকে কেউ পছন্দ করবে না। সত্যি কথার গুরুত্ব তাকে বোঝাবেন । নিজেরাও তার সামনে কখনোই , এমনকি নির্দোষ মিথ্যে (white lies) ,যেগুলো আমরা সাধারনত: বলে থাকি, তাও বলবেন না। তার আড়ালে বলুন। তাকে কখনো মিথ্যে আশ্বাস দেবেন না। তাকে বোঝান মিথ্যে বললে আমাদের মূল্য সবার কাছে কমে যাবে।বাচ্চার দুস্টুমিতে তাকে ভয়ানকভাবে বকলে বা মারলে কিন্তু তার মধ্যে মিথ্যে কথা বলার প্রবণতা বেড়ে যায়। বাচ্চাকে বকার সময় নিজেকে বোঝান; তার সত্যি, মিথ্যের সঙ্গে নিজের সম্মান গুলিয়ে দেবেন না। বাচ্চারা খেয়ালেও মিথ্যে বলে। ভাবুন, আপনি তাকে কেন বকা দিচ্ছেন? সে যাতে ঐরকম দুস্টুমি আর না করে, তাইতো! সুতরাং তার সাথে বোঝানো আর বকা দেবার মাঝামাঝি অবস্থার ব্যবহার করুন। ছয় বছরের আগে বাচ্চাদের কড়া শাসন না করাই ভালো। দুস্টুমি করলে তাকে বকা দিন কিন্তু সে সত্যি বললে সত্যি কথা বলার জন্য সবার সামনে তার প্রশংসা করুন।

উৎসাহে উৎসাহ দিনঃ

এ সময়টায় বাচ্চারা সবসময় নতুন কিছু করার জন্য উৎসাহে মুখিয়ে থাকে।এই অতি উৎসাহ অনেক সময় বড়দের বিরক্তি ও সমস্যার কারন হয়।কিন্তু এটা বুঝতে হবে যে এই নতুন কিছু করার (exploration) মাধ্যমে বাচ্চারা আসলে তাদের চারপাশের পরিবেশ ও পৃথিবীকে বুঝতে শুরু করে।তাদের আপাতভাবে অর্থহীন খেলাগুলো কিন্তু তার কাছে অনেক অর্থ বহন করে।তাই তার খেলাগুলোকে উৎসাহ দেওয়া উচিৎ যতটা সম্ভব। চেষ্টা করুন তাকে এমন খেলনা কিনে দেওয়ার, যার মাধ্যমে সে নতুন কিছু শিখতে পারে।ছেলেদের শুধু বন্দুক-গাড়ি এবং মেয়েদের শুধু পুতুল,রান্না-বাটি না কিনে দিয়ে ব্লক (block) বা ওই ধরণের কম্বিনেশন করার মত খেলনা কিনুন।

খাবার সময় শুধুই খাওয়াঃ

বাচ্চাদের যতটা পারা যায় মোবাইল থেকে দূরে রাখুন।রুটিন তৈরি করে দিন টিভি দেখার। খুব ছোটবেলায় কার্টুন দেখে দেখে যে খাবার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল, তার পরিবর্তন করুন। খাবার সময় তাকে গল্প বলতে পারেন।তাকে কথা বলতে দেবেন না খেতে-খেতে।তাকে খাবারের স্বাদ, গন্ধ, রং এসব বোঝান। চেষ্টা করুন সে যে খাবারটা খাচ্ছে, তার সম্বন্ধে সে যেন ভালোভাবে জানতে পারে। এইভাবেই তার মধ্যে একমুখী মানসিকতা তৈরি হবে।সে যে কাজ যে সময়ে করছে,সেই সময় সেই কাজের গুরুত্ব দেওয়া সম্পর্কে তার ধারণা তৈরি হবে।সাধারণ সাধারন বিষয় একটা চরিত্র ক্রমে ক্রমে তৈরি করে, তাই এগুলো লক্ষ্য রাখুন।

সারাদিনের গল্পঃ

আপনার শিশু স্কুলে কি করলো সারাদিন, তাকে জিজ্ঞেস করুন। সে যখন বলবে ,মন দিয়ে শুনুন।সেও আপনাকে জিজ্ঞেস করতে পারে, আপনি সারাদিন কি কি করলেন।তাকে তার মত করে যতটা সম্ভব ,বলুন। এতে আপনার আর আপনার সন্তানের মধ্যে বিশ্বাসের ভিত তৈরি হবে।সে আপনাকে কিছু লুকাবে না।কারন সে লুকোতে শিখবেই না।

তুলনা করবেন নাঃ

স্কুলের অন্যান্য বাচ্চাদের পারফরম্যান্স এর তুলনা বারবার আপনার বাচ্চার সাথে করবেন না। তার ফলে তার মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি হবে। মনে রাখবেন প্রত্যেকটা শিশুর বেড়ে ওঠার ধরণ আলাদা। শুধু পরীক্ষায় পাওয়া নম্বর আর মৌখিক পরীক্ষায় ভালোভাবেই উত্তর দিলেই কোনো বাচ্চা বেশি বুদ্ধিমান,সেটা প্রমাণিত হয় না। আপনার শিশুকে অন্যদের সাহায্য করা, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কথা মন দিয়ে শোনা, সময়মত স্কুলে যাওয়া, সময়ের গুরুত্ব বোঝা; এসব ব্যাপারে বেশি জোর দিন। শিশুর শেখার গতি তার বুদ্ধির উপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে তার আগ্রহের উপর।

বাড়িতে পড়তে বসাঃ

বাড়িতে শিশুকে প্রতিদিন একই সময়ে পড়তে বসান।চেষ্টা করুন সে যাতে নিজেই নিজের হোমওয়ার্ক করতে পারে। গৃহশিক্ষক কে বলুন তার শেখার উপর জোর দিতে, মুখস্থর উপর নয়। বাড়িতে তার পড়ার স্থান যাতে নির্দিষ্ট থাকে, পড়ার সময় আলো যাতে পেছন থেকে না পড়ে খেয়াল রাখুন।এতে চোখে চাপ পড়ে। সবচেয়ে ভালো হয় পাশ থেকে আলো পড়লে।সামনে থেকে আলো পড়লেও চোখে সামান্য চাপ পড়ে। টেবিল ল্যাম্প ব্যবহার না করাই ভালো। খেয়াল রাখবেন খুব বেশি উজ্জ্বল আলো না ব্যবহার করতে।আলোর উৎস ছড়ানো থাকলে সবচেয়ে ভালো। বাল্ব এর বদলে পড়ার সময় টিউবলাইট আদর্শ।

নিন্দা করবেন নাঃ

বাচ্চাদের সামনে কোনো অবস্থাতেই অন্যের নিন্দা করবেন না। আপনার বাচ্চাকেও কখনো অন্যের নিন্দা করতে প্রশ্রয় দেবেন না। তাকেও কখনো নেগেটিভ পরিচয় (negative identity) দেবেন না। বলবেন না “তুমি খুব খারাপ মেয়ে হয়ে গেছো।“ তার পরিবর্তে বলুন “তোমার মত ভালো মেয়ের কাছে এইরকম খারাপ কিছু আশা করা যায় না। তুমি নিশ্চয় বুঝেছ ,তুমি যা করেছ, সেটা ভুল করেছ। আর এরকম করবে না। ভালো মেয়েরা এমন করে না।“ দেখবেন সে তার ভালো পরিচয় (identity) বজায় রাখার জন্য এর পর থেকে প্রানপন চেষ্টা করবে।

শিশুকে কি ভয় দেখাবেন?

শিশুকে ভূত-প্রেত এসবের ভয় দেখাবেন না। তাকে পরিষ্কার করে বলুন, আপনি তাকে কোন জায়গায় যেতে মানা করছেন এবং কেন করছেন।তাকে সাপের,বা বিষাক্ত পোকা-মাকড়ের ভয় দেখাতে পারেন,যা সত্যিকারের ভয়েরই বিষয়। কাল্পনিক ভয়ের জগৎ থেকে অনেক শিশুই পরবর্তীকালে বেরোতে পারে না, যা তার ক্ষেত্রে বড় হলে মানসিক চাপের কারণ হতে পারে।

বাবা-মায়ের ঝগড়াঃ

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া লাগতেই পারে। কথা কাটাকাটি, মনোমালিন্য -এসব স্বাভাবিক। মাথা গরম হলে বাচ্চা সামনে আছে কিনা! ভাবার সময় থাকেনা। ঝগড়া নিশ্চয় করবেন। হ্যাঁ! সন্তানের সামনেই মন খুলে ঝগড়া করবেন ( দয়া করে ভাষা একটু সংযত রাখবেন, ওরা কিন্তু চুম্বকের মত হয় )। কিন্তু মাথা ঠান্ডা হয়ে গেলে,আবার সুখী পরিবারের ছবিটাও যাতে তার সামনে পরিষ্কার হয়। সন্তানের সামনেই যেমন ঝগড়া করেছেন, তেমনি তাকে কোলে নিয়েই স্বামী বা স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরুন। সন্তানকে বোঝান সংসারে ঝগড়া হওয়াটা স্বাভাবিক। সে যাতে আপনাদের মনোমালিন্য নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে না পড়ে, ভয় না পায়। দেখা গেছে, যে পরিবারে ঝগড়া ও তার পরবর্তী সময়ে মিল হয়ে যাবার স্বাভাবিক প্রবণতা আছে, সেই পরিবারের সন্তানরা বড় হলে বেশি হাসিখুশি হয়। সম্পর্কের মূল্য দেবার ক্ষেত্রে তাদের কুশলতা বেশি হয়।

গুড টাচ- ব্যাড টাচঃ

শিশুকে পরিষ্কারভাবে গুড টাচ-ব্যাড টাচ শেখান। আমাদের শরীরের ঢাকা অংশগুলোর কোমলতা বেশি ,তাই সামান্য আঘাতে সেখানে ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি হয়। তাকে এভাবে বোঝান। সব মানুষই খারাপ নয়। তাকে কেউ কোলে নিলে আপনি লক্ষ্য করুন, সেই মানুষটি নিরাপদ কি না? প্রয়োজন পড়লে বা সন্দেহ হলে ,সেই মানুষটিকেই পরিষ্কার বলে দিন, যে আপনারা আপনার শিশুকে কারো কোলে উঠতে দেন না। আপনার শিশুকেও জানিয়ে দিন যাতে সে ওই মানুষটির কাছে না যায়, কারণ আপনারা সেটা চান না। তবে দূর থেকে কথা বলতে কোনো সমস্যা নেই। শিশু পরবর্তীকালে ভালো আর মন্দ স্পর্শের পার্থক্য বুঝে যাবেই। তার আগে আপনারাই চেষ্টা করুন যাতে তার ক্ষেত্রে এই বোঝার সমস্যা বা confusion তৈরি না হয়। সে যাতে আপনাকে সব কথা পরিষ্কারভাবে বলতে পারে, তেমনভাবে তার সাথে মিশুন।তাকে বোঝান যে পৃথিবীতে ভালো আর মন্দ, দুই ধরনের মানুষই আছে। আর এটাও বলতে ভুলবেন না ,যে মন্দ মানুষের থেকে ভালো মানুষেরা সংখ্যায় বেশি। তাই পৃথিবীটা উপভোগ করতে হলে ভয়ে ভয়ে না থেকে শুধু একটু সাবধানে থাকতে হবে।অমূলক ভয়গুলি যাতে তার জীবনে চলার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, তার জন্যও তাকে তৈরি করুন। সাহসী ও আনন্দে ভরা শৈশব ভিত স্থাপন করুক একজন ভবিষ্যতের আনন্দিত , সাহসী নাগরিকের।

বিখ্যাত আমেরিকান সাংবাদিক ও পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া লেখিকা এলেন গুডমান লিখেছিলেন “ পিতা-মাতা হবার সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হলো আমাদের সন্তানদের জন্য পাওয়া ভয় থেকে আমাদের মুক্ত করে তাদের প্রতি আমাদের আশার আলো জ্বালিয়ে রাখা” (The central struggle of parenthood is to let our hopes for our children outweigh our fears) । আপনার সন্তান আপনার থেকেই এই পৃথিবীতে এসেছে।কিন্তু সেও একটি অন্য মানুষ। তারও নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ আছে। এই বয়সে সে যেমন অনেক কাজ নিজে নিজেই করতে পারে, তেমনি সে নিজেকেও স্বাধীন একটি মানুষ হিসেবে ভাবতে শুরু করে।তাছাড়াও তার স্কুলে তার একটি অন্য পরিচয় তৈরি হয়।আর আপনিও তো চান, আপনার সোনা স্বাবলম্বী হয়ে উঠুক। আপনার আঙুল ধরে টলোমলো করতে থাকা সেই ছোট্ট মানুষটি দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাক, চোখে অসীম স্বপ্ন নিয়ে, সোনালী এক ভবিষ্যতের দিকে। (চলবে)

অমিতাভ দাষ।
Child and adolescent counsellor. Child psycotherapist.
(whatsapp-7001596757)

Related News

Leave a Reply

Back to top button