পোর্টজিন

“ইলিশের মহিমা” লিখেছেন ঐশ্বর্য্য কর্মকার

Bengal Live পোর্টজিনঃ পোর্টজিন কি? পোর্টজিন একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। প্রতি সপ্তাহের রবিবার এটি বেঙ্গল লাইভের (bengallive.in) এর পোর্টজিন বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয়।

Aishwarya Karmakar bengal live portzine

 

ভারতের অনেক কিছুতে সাহেবদের মন মজলেও ইলিশের প্রতি প্রেম তাঁদের হয়নি। তার কারণই না কি ছিল কাঁটা। তাই সাহেবদের এই স্বর্গীয় স্বাদের ভাগ দিতে তৈরী হলো ” ধুমপক্ক ইলিশ ” অর্থাৎ ” স্মোকড ইলিশ “। সেই কোন কালে জীমূতবাহন আর সর্বানন্দ ইলিশ মাছের গুণগান গেয়ে গেছেন। সর্বানন্দের ” টিকা সর্বস্য ” গ্রন্থে আছে ইলিশ তেলের কথা।

মনসার-মাস শ্রাবণে চাঁদ সদাগরের ভৃত্য দুই ভাই জালু ও মালু নদীতে হাজার প্রচেষ্টায় কোনও মাছ পায় না। শেষে মনসা দেবীর স্তুতিফলে জাল ভরে ওঠে মাছে, ‘ইলশা ধরিল কাতলাগুটি’ (ক্ষেমানন্দ)। পঞ্চদশ শতকের বিজয়গুপ্ত, ষোড়শ শতকের দ্বিজবংশীদাস হয়ে পলাশি-দেখা ভারতচন্দ্র রায়— মঙ্গলকাব্য জুড়ে ইলিশ আর ইলিশ ।

রবীন্দ্রনাথ ‘ছেলেবেলা’-য় আব্দুল মাঝির গল্প বলতে গিয়ে পদ্মানদী থেকে জ্যোতিদাদার জন্য নিয়ে আসা ইলিশ মাছের স্মৃতিচারণ করতে বিস্মৃত হননি। গল্পে উঠে আসে মাছের উদাহরণ— ‘ইলিশ মাছ অমনি দিব্যি থাকে, ধরলেই মারা যায়। প্রতিজ্ঞাও ঠিক তাই, তাকে বাঁধলেই সর্বনাশ।’
পুবদেশে বিয়েবাড়িতে উনুনকে বরণ করার সময় মহিলাদের বন্দনাগীতি: ‘ইলিশ মাছ কাটে বৌ/ ধার নাই বঁটি দিয়া/ ইলিশ মাছ রান্ধে বৌ/ কচু বেগুন দিয়া।’ মেদিনীপুরে বিবাহ-আচারে ‘কাঁদন গীত’ আবশ্যক। বাপের বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় কনেকে কাঁদতে কাঁদতে গাইতে হয়: ‘ইলিশ মাছের চেতরা কাঁটা, দাদা গো…’

আবার রাঢ় দেশে ইলিশ সহজলভ্য নয় । টুসুগানে উঠে আসে এর সমর্থন: ‘অ টুসু ইলিশ ইলিশ করিস না/ ইলিশ লিয়ে তুর লালসা মানায় না।/ গঙ্গা পদ্মায় যেমন ইলিশ মেলে/ রাঢ়েরা খুশি পুস্তু পেলে।’ এর সঙ্গে যেন মিলে যায় নিরামিষ আহারী বৈষ্ণবদের খেদোক্তি: ‘কেন মাইতবো ইলিশে/ পুস্ত আমার কম কিসে?’ ভাদুগানে টুসুর মতো পোস্তপন্থা না নিয়ে ভাদুকে দেওয়া হয়েছে ইলিশ-আশ্বাস: ‘ভাদ্রমাসে ভাদু খাবে ইলিশ/ গেলে পদ্মায় গঙ্গায়।’

পৌষ সংক্রান্তির দিন অথবা সরস্বতী পুজোর দিন নানা অঞ্চলে ইলিশ-কেন্দ্রিক লোকাচার আছে। জোড়া ইলিশ সিঁদুর-হলুদ মাখিয়ে, প্রদীপ জ্বেলে, ধান-দুব্বো দিয়ে বরণ করে ঘরে তোলা হয়। উলুধ্বনির সঙ্গে কোথাও আবার গানের রীতি আছে: ‘…ইলিশ মাছ হাইস্যা বলে/ খলসা মাছ রে ভাই/ তুই থাকস ঝাড় জঙ্গলে/ আমি পদ্মায় যাই…।’

ইলিশ কাটার পর তার আঁশগুলি ঘরের প্রধান খুঁটির নীচে পুঁতে রাখা হয় এই বিশ্বাসে, মেয়ের বিয়ের সময় এগুলো পয়সা হয়ে যাবে!

নুরপুর, তারাগঞ্জে জেলেরা প্রথম যে ইলিশটিকে ধরে, তার আঁশ কপালে টিপের মতো পরে।

বু্দ্ধদেব বসুর ‘ভোজনশিল্পী বাঙালী’ নামক রন্ধন সাহিত্যে ‘পঞ্চপদী ইলিশ’-এ মধুময় সুখাদ্য বিলাসের ইশারা। ইলিশের মুড়োর সঙ্গে স্নিগ্ধ লাউ, কাঁটা দিয়ে রাঁধা ঘন মুগডাল, কচি কুমড়োর সঙ্গে কালোজিরে দিয়ে ইলিশের পাতলা ঝোল, ‘সর্ষপমণ্ডিত’ কলাপাতায় মোড়া পাতুরি, সবশেষে ইলিশপুচ্ছায়িত একটা ঠান্ডা অম্বল।

পরিমল গোস্বামী ১৯৭১-এর ৬ জুন আকাশবাণী-তে ইলিশ বিষয়ক রম্যকথিকা পাঠ করেছিলেন। এই রসজ্ঞ লেখক তাঁর ‘স্মৃতি চিত্রণ’-এ জানিয়েছেন ‘ইলিশ মাছের লুকার বড়া’-র কথা। দেশের বাড়িতে ছেলেবেলায় তাঁরা ভোর থাকতে নদীর পাড়ের মাছ-কাটারুদের কাছ থেকে কিনে আনতেন ‘লুকা’ (যকৃৎ)।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা ডায়মন্ড হারবারের ইলিশের ভক্ত।

ভোজনরসিক কলকাতার বাবুরা একদা ইলিশ চেখেই বলে দিতে পারতেন মাছটি বাবুঘাটের না বাগবাজার ঘাটের, নাকি মাঝগঙ্গার।

সুপ্রিয়া দেবী শক্তি সামন্তের ‘আরাধনা’ ছবিতে রাজেশ খন্নার বিপরীতে অভিনয় করবেন। অগ্রিম নিয়েছেন। গোল বাঁধল ডায়টিশিয়ানের পরামর্শে। টাকা ফেরত দিয়ে দিলেন ইলিশ খেতে পারবেন না বলে।

ভি বালসারা সর্ষে-ইলিশ খাওয়ার লোভে শিক্ষার্থীদের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর নিমন্ত্রণ যেচে নিতেন।

রামলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের রম্যনাটক ‘কষ্টিপাথর’-এ বাবু নবীন এক টাকায় এক জোড়া ইলিশ কিনে দর্শকদের দেখিয়ে বলছে: ‘রাজপুত্তুর মশাই রাজপুত্তুর। কী যে গড়ন যেন ননীর চাপ থেকে কেটে তুলেছে। দিব্বি দোহরা, একটু পাশ থেকে গোলাপীর আভা মাচ্চে।’

১৮৯৭-এর এই নাটকের আশপাশের সময়ে বঙ্গদেশের এক থিয়েটার-মালিক জনপ্রিয় থিয়েটারগুলোকে টেক্কা দিতে নাটক শেষে দর্শকদের উপহার দিতেন আস্ত একটা ইলিশ! সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের ভাষ্য ছিল এ রকম: ‘অভিনয় দেখিতে আসিবার সময় গৃহিণীকে বিশেষ করিয়া বলিয়া আসিবেন যেন শেষ রাত্রে উনানে আগুন দিয়া তৈল প্রস্তুত রাখেন। অভিনয় দেখিবার পর, বাড়ি গিয়া গরম গরম ইলিশ মাছ ভাজা খাইয়া মন ও রসনায় তৃপ্তি সাধন করিবেন।’
ইলিশ এমনি এক মাছ যাকে পাওয়া গেছে সাহিত্য থেকে পুরানের গল্প গুলো তে।

বেলুড় আশ্রমের ঘর থেকে স্বামীজি দেখলেন জেলেদের ইলিশ ধরার আনন্দ। সে বার গঙ্গার একটা প্রমাণ মাপের ইলিশ কেনা হল। পূর্ববঙ্গীয় শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীকে ডেকে বললেন, ‘তোরা নূতন ইলিশ পেলে নাকি পূজা করিস, কি দিয়ে পূজা করতে হয় কর।’

স্বামী প্রেমানন্দ লিখেছেন, ‘…আহারের সময় অতি তৃপ্তির সহিত সেই ইলিশ মাছের ঝোল, অম্বল, ভাজা দিয়া ভোজন করিলেন।’

আষাঢ়ের আকাশ আর বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে। এই রকম সময়ে পাতে একটু গরম ভাত আর ইলিশ মাছের তেল নিয়ে বাঙালি দুপুরের আহার করবে – তবেই না সে সত্যিকারের বাঙালি হবে।

তথ্য ঋণ : এবিপি আর্কাইভ।

 

কীভাবে লেখা পাঠাবেন?
নীচে উল্লিখিত হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার কিংবা ইমেল আইডিতে লেখা পাঠাতে পারবেন।
হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার~ 9635459953
ইমেল আইডি~ bengalliveportzine@gmail.com
লেখার সঙ্গে নিজের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং একটি ছবি পাঠানো আবশ্যক।
ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে নিজের তোলা দুটো ছবি পাঠাতে হবে।

Related News

Leave a Reply

Back to top button