পোর্টজিন

আতঙ্ক – রজত ঘোষ

Bengal Live পোর্টজিনঃ পোর্টজিন কি? পোর্টজিন একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। প্রতি সপ্তাহের রবিবার এটি বেঙ্গল লাইভের (bengallive.in) এর পোর্টজিন বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয়।

bangla golpo rajat ghosh

 

আজ থেকে প্রায় আড়াই বছর,হ্যাঁ আড়াই বছর আগের ঘটনা। মোটামুটি এক বছর লেগেছিল তা থেকে বেড়িয়ে আসতে। সেই ভয়াবহ প্রভাব থেকে সম্পুর্নরুপে বেড়িয়ে আসতে পারিনি আজও। তো শুরু করা যাক। সেই সময় আমার একটি মোবাইল ফোনের বড্ড দরকার ছিল। অনেককেই বলে রেখেছিলাম একটা পুরোনো মোবাইল ফোনের ব্যাপারে, যদি কেও জোগার করে দিতে পারে। আসলে মানুষটা আমি আধুনিক-ই কিন্তু প্রযুক্তির দিকে আমি একটু পুরোনো প্রেমী।এখনকার ফোন কেমন জানি খাপছাড়া লাগে। তার কিছুদিন পরেই একটি নোকেয়া সেট এর খোজ দেয় আমারই এক বন্ধু খোকোন। এখনকার দিনে ওর মতো বন্ধু পাওয়া দুস্কর।ফোন পেয়ে তো আমি রীতিমত খুশি। তো কিনে নিলাম ফোনটা। আবার প্রতিদিন সকালে হাটতে না গেলে আমার ভালো লাগে না।বাড়িটা আমার শহরেই, কিন্তু জনবসতি থেকে খানিকটা দূরে।বাড়িটি আমার পুর্বপুরুষের,জীবনেও স্থায়ী ছিলাম ।ভগবানের কৃপায় ভালোই ছিলাম বলা যেতে পারে।

ADVERTISEMENT

কিন্তু নিজস্ব কোনো বাড়ি বানাইনি।কারন, আমার বাবাই আমাকে বলেছেন নতুন কোনো বাড়ির কথা ভাবতে না;হ্যাঁ,বাড়িতে আমি আর বাবা থাকতাম। কিছু মেরামতি করে নিয়েছি শুধু। বাড়িটি জনবসতি থেকে খানিকটা দূরে থাকায় লোকজনের আনাগোনা অনেক কম, কিন্তু খুব বেশি একটা অসুবিধা হয় না, যেহেতু নিজের গাড়িতেই যাওয়া আসা। কিন্তু সকালের হাটতে যাওয়াটা খানিকটা সঙ্কোচ তুলে ধরে মনে। কারণ, বাড়ি থেকে বেড়োতেই বেশ বড়ো ঘন জঙ্গলের পাশ দিয়ে রাস্তা।পাশাপাশি সকালে গাড়ির সংখ্যাও কম।জঙ্গলটি বেশ বড়ো ভেতরের দিকে। তো হঠাৎ একদিন সকালে হাটতে যাওয়ার সময়, যেতে যেতে আমার সেই ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে ফোন আসে। তখন আমি জঙ্গলের একদম সামনে। যেন ভেতরের অন্ধকার পরিবেশ আমাকে চেনে আর আমারই অপেক্ষা করছিল। তো সেই মতো ফোনটি তুললাম আমি। ফোনটি তোলার পর কিছুক্ষণ কোনো সারাশব্দ পেলাম লা, তারপর যখনই কলটি কাটতে যাচ্ছিলাম ঠিক তখনই ফোনের ওপার থেকে এক চাপা ভারী গলায় আওয়াজ শুনতে পেলাম, বলছিল, “ভেতরে এসো, ভেতরে।”

স্বাভাবিক মানুষের গলার আওয়াজ থেকে অনেকটা আলাদা। মনে হচ্ছিল যেন দুটো আওয়াজ একসাথে বলছে। তারপর “ভেতরে” বলতে কোন ভেতরে? ,কোথায়? কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমি বললাম, “কোন ভেতরে? কোথায় যাবো? আর কে আপনি?” কিন্তু ওপার থেকে একটাই শব্দ “ভেতরে এসো, বা দিকে, ভেতরে। ” লক্ষ্য করে দেখলাম বা দিকে জঙ্গল ছাড়া তো আর কিছুই নেই। ওখান থেকে আমাকে আবার কে ডাকবে? ভাবলাম রং নাম্বার। ফোনটিও কেটে গেল। তারপর বাড়ি ফিরে গেলাম। ব্যাপারটির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি।তো বড়ি ফিরে বেড়িয়ে পড়লাম কাজে।আমাদের বাড়ির পাশে একটিমাএ বাড়ি আছে, সঞ্জিববাবুর বাড়ি। বাইরে গেলে আমি ওনাকেই বাড়ির প্রধান দরজার এক সেট চাবি দিয়ে রাখি। আসলে ওনার সঙ্গে এখানে এসেই দেখা। তারপর আমাদের বাড়িতে বেশ কয়েকবার চা খেতেও এসেছিলেন নিজে থেকেই। তা থেকেই ভালো সম্পর্ক হয়ে ওঠে আরকি। তারপর থেকেই চাবি দিয়ে আসা যেহেতু বাড়িতে আমার বয়স্ক বাবা আছে,আমি সারাদিন বাড়িতে থাকতে পারি না, তাই কখন কি লাগে এই ভেবে।

তো সেদিন বাড়ি ফিরতে অনেকটা দেরি হয়ে যায়। রাত প্রায় 11 টা, গাড়িতে। তো সেই সময় আবার ফোনের রিং বাজতে থাকে। গাড়িটা পাশে দাড় করিয়ে ফোন টা বের করে দেখতেই আবার বিভ্রান্তিতে পরে যাই। ঠিক সেই নম্বরেই ফোন যেটা থেকে আজ সকালে এসেছিল। অনেক রাত হওয়ায় কলটি না তুলে কেটে দি।তো বাড়ি ফিরে দিনের প্রবল ক্লান্তিতে এক নিমিসেই ঘুম পেয়ে যায়, কিছু খেতেও ইচ্ছা ছিল না আর। তারপর সকালে উঠেই দেখি বাড়ির সমস্ত জিনিসপত্র এদিকওদিক পরে আছে। বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে জিঙ্গাসা করায়, বাবাও হতভম্ব হয়ে পরলো। কিছুই বুঝতে পারলাম না। পরে ভাবলাম হয়তো কোনো জঙ্গলী বিড়ালের কাজ। যদিও আগে এমন হয়নি। আর পাশের জঙ্গলেও বিড়ালের বড়ো উৎপাত পাশাপাশি ঘরের একটি জানালাও খোলা দেখলাম সকালে। সব গুছিয়ে আবার হাটতে বেড়িয়ে পরলাম। জঙ্গলটির সামনে যেতেই সেই বেজে ওঠে ফোনটি। আবার সেই নম্বরটি। ভাবতে ভাবতে ফোনটি তুলতেই আবারও সেই গলায় শোনা যায় “বা দিকে ,ভেতরে এসো ,ভেতরে। “পরপর দুদিন এমন টা হতে পারে না ভেবে ,এগিয়ে গেলাম সেই জঙ্গলের ভেতরে। ধীরে ধীরে আওয়াজটা প্রবল হয়ে উঠল। একটু রহস্য প্রেমী লোক তো তাই আটকাতে পারিনি নিজেকে। জঙ্গলের আরও অন্ধকারে চলে যেতে লাগলাম। যেতে যেতে জঙ্গলের অনেকটা ভেতরে পৌছে গেলাম।

চারিদিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। এত সহজে ভয় পাওয়া লোক না আমি তবু সামান্য অস্বস্তিকর লাগা শুরু। আর এদিকে সেই গলার শব্দ। ভাবতে লাগলাম এসে কোনো ভুল করিনি তো। গাঁ টা কেমন জানি কেঁপে ওঠে। এইভেবে যখনই বাবাকে কল করার জন্য বাঁ হাতে রাখা ফোনটি উদ্দেশ্যে হাতটা সামনে আনি তখন যা দেখি তা আমার কল্পনার বাইরে। হাতে আমার কোনো ফোন ই নেই। একটি গাছের ডাল ধরে আছি দেখি। তখনই মাথায় আসে আজ সকালে বাবা ফোনটি চেয়েছিল কোনো এক দরকারে। তাই ফোনটি আর নিয়ে আসিনি। তো ফোন রিং এর আওয়াজটা কোথা থেকে এলো আর ওই আওয়াজটাই বা শোনা গেল কিভাবে! তারপর সেই আওয়াজটা কানে বেজেই চলেছে, যেন আমাকে অনুসরণ করছে। কিন্তু কেন আর কিভাবে? এই ভেবে আমি রীতিমতো হিমসিম খেয়ে যাই। তারপর সেখান থেকে পেছনে ছুটে যাই সেই জঙ্গল থেকে বাইরে বেড়োনোর আশায়। কিন্তু বহুক্ষণ দৌড়োনো সত্বেও রাস্তা তো পেলাম না বরং পৌছে যাই আবারও জঙ্গলের সেই স্থানে।তারপর মাথা যেন আর কাজ করছে না। এদিক ওদিক প্রানপনে দৌড়োতে লাগলাম। হঠাৎ আবারও সেই মহিলা-পুরুষ মিশ্রিত শব্দ বলে ওঠে “খোদো ,খোদো “।

এদিকে আমার বিবেক ধরে রাখাটা লড়াই হয়ে দাড়িয়েছে। তাও কোনো রকম নিজেকে সামলে এদিক ওদিক দেখতেই চোখে পরে এক রক্তলাগা কুঠার। কেমন জানি চেনা চেনা লাগলো। তো সেই নিয়েই কোনোরকমে কিছু না ভেবে মাটি খোদা শুরু করি।কিছুক্ষন খুড়তেই চোখে পরে এক মহিলা ও পাশে এক বাচ্চার ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ।আমি জীবনে কখনও এমন কিছু দেখিনি। সেই দেখে শরীরে বেচে থাকা শক্তি জোগার করে সেখান থেকে ছুটে যেতে থাকি। জানিনা কোনদিকে ছুটছি।দৌড়োতো দৌড়োতে রাস্তায় পৌছেই এক গাড়ি র সামনে নিজের চেতনা হারিয়ে ফেলি। যখন আমার জ্ঞান আসে আমি তখন পাশের হাসপাতালে।পাশে বসে আছেন বাবা। পুলিশও আমারই সামনে দাড়িয়ে।যে গাড়িওয়ালা লোকটা আমাকে নিয়ে এসেছে হাসপাতালে,সে আমাকে দেখেই পুলিশকে ফোন করে দেয়। আমি সব জানাই ওদের। তারপর পুলিশ সেই জঙ্গলে গিয়ে তদন্ত করে নিয়ে আসে সেই মৃত দুটি। আমি কিছুদিন পর হাসপাতাল থেকে ফিরে আসি বাড়িতে। আরও কিছুদিন পর পুলিশ আমায় জানায় সেই বাচ্চাটি আসলে মহিলাটির ই সন্তান।

আর তাদের যে মেরেছে তা শুনে আমার মাথায় যেন বাঁশ পরে যায়। সে আর কেও না আমারই প্রতিবেশী সঞ্জিববাবু। মহিলাটি তাদেরই বাড়িতে কাজ করত।তাই চুরি করার সন্দেহ করে বাচ্চাকে সহ মেরে ফেলে।সেই মহিলা আর বাচ্চাটির কথা শুনে বেশ খারাপ লাগে। পুলিশ এও জানায় সঞ্জিবের মানসিক পরিস্থিতি খারাপ ছিল। তার সঙ্গে কথাবার্তার মাধ্যমে তা বুঝতে পারে পুলিশ।সঞ্জিবের বাড়িতে আনেক দিন আগে সেই কুঠারটা দেখেছিলাম বলেই তা চেনা লাগছিলো।কিন্তু আমার সঙ্গে এত দেখাসাক্ষাৎ হওয়া সত্ত্বেও আমি বুঝতে পারিনি। এমনকি বাড়ির চাবিটাও দিয়ে রেখেছিলাম তাকে। এই ভাবনা এখনও আমাকে ভুলে যেতে দেয়নি সেই ঘটনাটা। এরকম মানুষ, যা কিছু করে দিতে পারতো।ভগবানের কৃপায় বেচে আছি আজও।

কীভাবে লেখা পাঠাবেন?
নীচে উল্লিখিত হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার কিংবা ইমেল আইডিতে লেখা পাঠাতে পারবেন।
হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার~ 9636459953
ইমেল আইডি~ bengalliveportzine@gmail.com
লেখার সঙ্গে নিজের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং একটি ছবি পাঠানো আবশ্যক।
ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে নিজের তোলা দুটো ছবি পাঠাতে হবে।

Related News

Leave a Reply

Back to top button