পোর্টজিন

অসুর – সংগীতা মিশ্র

Bengal Live পোর্টজিনঃ পোর্টজিন কি? পোর্টজিন একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। প্রতি সপ্তাহের রবিবার এটি বেঙ্গল লাইভের (bengallive.in) এর পোর্টজিন বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয়।

bangla golpo portzine sangita mishra

 

-“রোল নাম্বার ওয়ান রিম্পা দাস, রোল নাম্বার টু মিতালি সাহা…… রোল নাম্বার থারটি টু বিনোদিনী রায়…..।”
-“ইয়েস স্যার।”
-“ইসস! শালা বাপে ভিখারি, বস্তিতে থাকিস আবার মেয়ের নাম রেখেছে বিনোদিনী, শখ কত !”
বিনোদিনী রায় কাঁকুড়গাছি প্রাইমারি স্কুলের ক্লাস ওয়ান-এর ছাত্রী। স্কুলের পাশেই বস্তি। সেখানেই থাকে ছোট্ট বিনোদিনী। তার বাবা সারাদিন ভ্যান চালিয়ে রাতে মাতাল হয়ে বাড়িতে আসতো। এসেই বিনোদিনীর মাকে গালিগালাজ মারধর করে টাকা কেড়ে নিয়ে চলে যেত। আর তার পরে পরেই বিনোদিনীর মা সেজেগুঁজে কোথায় যেন বেরিয়ে যেত, আর ভোরবেলা আসতো। মিতালিকে একাই থাকতে হতো রাতে।
মিতালির অংক করতে খুবই ভালো লাগতো। কিন্তু স্কুলে অংকের স্যার যিনি ছিলেন তিনি সেভাবে শেখাতেন না। শুধু বাড়িতে করতে দিতেন। একদিন স্কুলে মিতালি সেই অঙ্কের স্যারকে বলল, “মাস্টারমশাই এই অংকগুলো পারিনি, শিখিয়ে দেবেন?”
সেদিন অংকের মাস্টারমশাই তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, “সন্ধ্যায় বাড়িতে আসিস জিলিপি খাওয়াবো, অল্প আদর করবো আর এই সব অঙ্কগুলো শিখিয়ে দেবো।”
বিনোদিনী বাড়িতে এসে মাকে সানন্দে সব কথা বলেছিল। বিনোদিনীর মা ওকে বুকে চেপে ধরে বলেছিল, “যাসনি বিনি, ওরা অসুর। যাসনি তোকে আর অঙ্ক শিখতে হইবো না, আর ওই স্কুলেও যেতে হইবো না। আমি তোকে কলকাতায় নিয়া যামু তোর টুম্পা মাসির বাড়ি। তুই এখন থেকেই ওখানেই থাকবি। ”

এরপর বিনির জীবনটা পাল্টে যায়। বিনি লক্ষ্য করে এখানে কত বড়ো বড়ো গাড়ি। সবাই কেমন চকচকে জামাকাপড় পরে। লোকজন ছুটছে শুধু। এখানে মাসির বাড়িও কেমন ঝা-চকচকে। কতরকম খাবার-দাবার। বিনি যেন স্বর্গতে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু একটা স্বপ্ন বিনিকে সেই কাঁকুড়গাছি থেকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সেই স্বপ্নটা বিনি মাঝেমাঝেই দেখে। একটা মেয়ে লম্বা লম্বা চুল, গোটা গায়ে রক্ত মাখা। এক হাতে খাড়া, আর অন্য হাতে কাটা মুন্ডু। সেখান থেকেও রক্ত ঝরছে। সেই কাটা মুন্ডুটা আর কেউ নয়, বিনির অঙ্কের স্যারের কাটা মুন্ডু। বিনি আগে ভয় পেতো এই স্বপ্নটা দেখে। কিন্তু এখন পায়না, কারণ সে মাঝে মাঝেই ওই স্বপ্নটা দেখে।
প্রায় দুবছর হল বিনোদিনী কলকাতায় এসেছে। একদিন বিনোদিনীর মাসি বললো, “দেখ বিনি এখনতো তুই বড়ো হয়েছিস, আর অনেক দিন তো হল। এবার তোকে নিজের কাজ করে পেট চালাতে হবে বাপু। আর বসে খাওয়াতে পারব না।”
বিনোদিনী বুঝতে পারে না ও কী করবে ? ওর পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছে ছিল। সেটাও করেনি। এরই মধ্যে একদিন বিনোদিনীর মাসি বিনোদিনীকে এক বড়ো বাড়িতে নিয়ে যায়। বাড়িটা বাইরে থেকে বড়ো হলেও, ভেতরে ছোটো ছোটো অন্ধকার ঘর, এরকমই একটা ছোটো অন্ধকার ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বিনোদিনীকে। সেখান থেকেই শুরু হয় বিনোদিনীর নতুন জীবন।
নতুন পেশা বেশ্যাবৃত্তিতে বিনোদিনী বেশ ভালোই নাম অর্জন করেছিল। তখন বেশ্যাপাড়ায় সবার মুখে মুখে বিনোদিনীর নাম…. !
বিনোদিনী রায় থেকে নাম বদলে হলো নটী-বিনোদিনী। তখন বিনোদিনীর রমরমা বাজার। তবে বিনোদিনী তখন মাঝেসাঝে ওই স্বপ্নটা দেখতো !
এরই মধ্যে একদিন বেশ্যা পাড়ায় এলো প্রতাপ সিং। দিল্লীতে কী সব ব্যবসা করে, অনেক বড়োলোক। বিনোদিনীর সাথে প্রতাপের ঘনিষ্ঠতা হলো বেশ। প্রতাপ তাকে দিল্লী নিয়ে যেতে চাইলে বিনোদিনী রাজি হয়ে যায়। তার মনটা যে সে প্রতাপকে দিয়েছিলো !
এরপর প্রতাপ এর সাথে দিল্লী পাড়ি দেয় বিনোদিনী। কিন্ত সেখানে গিয়ে অন্য এক জগৎ। প্রতাপ কোনো সাধারণ ব্যবসা করে না। সে হলো সেখানকার নামকরা ক্রিমিনাল। দেশের বাইরে অস্ত্র পাচার করে। এছাড়া খুন, মেয়ে পাচার, স্মাগলিং এসবও করে। প্রতাপের আরো পাঁচ সঙ্গী আছে। তারা প্রতাপকে এসব করতে সাহায্য করে।
দিল্লীতে আসার পর প্রতাপ এর সাথে সাথে তার পাঁচ সঙ্গীও বিনোদিনীকে ভোগ করতো, আর তার সাথে চলতো সিগারেটের ছ্যাঁকা। প্রতাপ বিনোদিনীকে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে এক পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করতো।

-“স্যার, প্রতাপের পাঁচ সঙ্গীর মধ্যে এক জন খুন হয়ে গেছে।”
-“কী বলছো ! এটা সত্যি?”
-“এটা পাক্কা খবর স্যার, বডি পোস্টমর্টেম এ পাঠানো হয়েছে। ”
এই খবরটা শুনে মনে মনে বেশ আনন্দিত হলেন দিল্লী ক্রাইম ব্রাঞ্চ-এর অধিকর্তা অগ্নিব্রত ব্যানার্জী। দিল্লীর সবচেয়ে বড়ো ক্রিমিনাল প্রতাপ সিং এবং তার সঙ্গীদেরকে এতদিন অনেক চেষ্টা করেও ধরতে পারেননি তিনি। বারবার তারা উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বা টাকার জোরে ছাড়া পেয়ে গেছে। আজ তাঁদের মধ্যে একজন মরেছে।
-“মিস্টার দাস, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এলো? কী আপডেট পেলে?
-“স্যার, ভিক্টিমকে গলার নালী কেটে খুন করা হয়েছে। তার সাথে সাথে আরেকটা জিনিস শুনলে আপনি অবাক হবেন, ভিক্টিমের পিঠে জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে ‘অসুর’ লেখা।”
-“কী বলছো ! তাহলেই খুনী কে হতে পারে?”

-“স্যার, স্যার !”
-কী ব্যাপার মিস্টার দাস, এত উত্তেজিত হয়ে আছো, কিছু বলবে? আচ্ছা তুমি প্রতাপ এর সঙ্গীর খুনির কোনো খোঁজ পেলে? ”
-“স্যার প্রতাপের আরো দুজন সঙ্গী খুন হয়েছে, এবং তাদের প্রত্যেকের সেই একই ভাবে গলার নালী কাটা আর পিঠে জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে ‘অসুর’ লেখা।
এবার মুখার্জিবাবুর কপালে ভাঁজ পরলো, সে তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো, ” মিস্টার দাস গাড়ি বের করো ”
-“কেন স্যার? কোথায় যাবেন?”
-“দুর্গা খুঁজতে।”
-“কী বলছেন স্যার, বুঝলাম না। ”
-“ও তোমার মোটা মাথায় ঢুকবেও না!”

মিস্টার মুখার্জির গাড়ি এসে দাঁড়ালো প্রতাপ সিং-এর বাড়ির সামনে। কলিং বেল বাজাতেই একজন মহিলা বেরিয়ে এলো। দেখে যা বোঝা যাচ্ছে, বছর চব্বিশের হবে সেই তরুণী, চেহারার একটা সাজানো ভাব, চুলটা ছোটো করে ঘাড় অবধি কাটা তবে চোখের চাহনি কেমন যেন শান্ত, একটা স্লিপব্লেস কুর্তি পরনে, সাথে পাটিয়ালা প্যান্ট, প্রথম দেখাতে যেকোনো পুরুষই সহজেই আকৃষ্ট হবে !
-“প্রতাপ সিং কোথায়?” মুখার্জি বাবু জিজ্ঞাসা করলেন।
-“উনি একটু বাইরে গেছেন।”
-“ওহ, কোথায় গেছে জানেন?”
-“খুব সম্ভবত উনি শ্মশানে গেছেন ওনার বন্ধুদের শেষকীর্তি সম্পন্ন করতে।”
-“আপনি কে? ”
-“আমি বিনোদিনী।”
-“আপনি ওনার কে হোন?”
-“বান্ধবী !”
-“ঠিক আছে উনি আসলে ওনাকে পুলিশ স্টেশনে পাঠিয়ে দেবেন, দিল্লী ক্রাইম ব্রাঞ্চ !”

এরপর প্রায় একসপ্তাহ পরে আবার খবর এলো প্রতাপ এর শেষ দুই সঙ্গীকেও খুন করা হয়েছে সেই একই ভাবে, এই খবর শুনে গোটা ক্রাইম ব্রাঞ্চ উদ্বিগ্ন হয়ে পরলো।

দিল্লী ক্রাইম ব্রাঞ্চএর অধিকর্তা অগ্নিব্রত মুখার্জি ভেবে পাচ্ছে না কি করবে, শুধু বুঝতে পারছে এর পরের ভিক্টিম প্রতাপ সিং নিজেই।
সিগারেটে টান দিতে দিতেই হুট্ করে মিস্টার দাস কে বললেন “গাড়ি বের করো তাড়াতাড়ি, যেতে হবে।”
-“স্যার কোথায় যাবেন?”
-“প্রতাপ সিং এর বাড়ি। ”
-“স্যার, ওখানে কেন? ”
-“তাড়াতাড়ি চলো নাহলে দূর্গার বোধন হওয়ার আগেই দূর্গার বিসর্জন হয়ে যাবে!”

ইতিমধ্যে তাঁদের গাড়ি আবার প্রতাপ সিং এর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো । প্রতাপ সিং এর বাড়ির দরজা বন্ধ ভেতর থেকে, সেই দরজা ভাঙা হলো, ভেতরে গিয়ে দেখা গেলো, মেঝেতে প্রতাপ বাবু পরে আছে, তার ও সেই একই ভাবে গলার নালী কাঁটা, পিঠে সেই একই ভাবে ‘অসুর’ লেখা, সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিনোদিনী, তার চোখেমুখে নৃশংসতা, সারা শরীরে রক্ত ছিটে আছে, এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট আর একহাতে একটা চাকু, সেখান থেকেও রক্তের ফোটা ঝরে পরছে টপ টপ করে।
-“মিস বিনোদিনী আপনি চাকু টা ফেলে দিন।”
-“নাহ, স্যার ‘অসুর’ বধ শেষ এবার আমার বিসর্জনের পালা!”
-“বিনোদিনী আপনি চাকু টা ফেলে দিন, আমি কথা দিচ্ছি আমি আপনার সাথে হওয়া অন্যায় এর সুবিচার পাইয়ে দেবো, আপনি প্লিজ এভাবে নিজেকে শেষ করে দিবেন না।”
-“নাহঃ স্যার আমি আপনাদের কাউকে বিশ্বাস করিনা আপনারা হলেন ‘অসুর’ !”
-“না বিনোদিনী আপনি ভুল ভাবছেন সবাই ‘অসুর’ হয়না। ”
কিন্ত তার আগেই বিনোদিনী নিজের শরীরটা এফোর-ওফোর করে দিলো।
মিস্টার দাস দীর্ঘনিঃশাস ফেলে বললেন, “দুর্গার বিসর্জনটা হয়েই গেল তবে!”

 

 

কীভাবে লেখা পাঠাবেন?
নীচে উল্লিখিত হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার কিংবা ইমেল আইডিতে লেখা পাঠাতে পারবেন।
হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার~ 9636459953
ইমেল আইডি~ bengalliveportzine@gmail.com
লেখার সঙ্গে নিজের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং একটি ছবি পাঠানো আবশ্যক।
ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে নিজের তোলা দুটো ছবি পাঠাতে হবে।

Related News

Leave a Reply

Back to top button