পোর্টজিন

পোস্টমর্টেম – নয়ন মালিক

Bengal Live পোর্টজিনঃ পোর্টজিন কি? পোর্টজিন একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। প্রতি সপ্তাহের রবিবার এটি বেঙ্গল লাইভের (bengallive.in) এর পোর্টজিন বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয়।

bengal live portzine bangla golpo

 

 

মঞ্জিলা বিছানার ওপর উসখুস করতে থাকে। দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ির কাঁটা গুলো টিকটিক আওয়াজ তোলে ক্লান্তিহীন ভাবে ছুটে চলে নিজের গতিপথে। রাত দশটা ছুঁই ছুঁই। বিছানার একপাশে তীব্র লাইটের আলোটা চোখটাকে ধাঁধিয়ে দেয়। সেখানে তখনও নিখিলেশ একনিষ্ঠ চিত্তে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায় তার গল্পের চরিত্রগুলোকে। লেখবার সময়ে তার কোন নিয়ম কানুন নেই । এক একদিন মধ্যরাত পর্যন্ত লিখে চলে। সেদিন ভীষণ অস্বস্তি লাগে মজিলার । বিরক্ত হয় নিখিলেশের প্রতি। লাইটের তীব্র আলো চোখে এসে পড়ায় কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না।
আজ পর্যন্ত একটা লেখা কোথাও ছাপা হয়নি তার । তবু নিয়ম করে লেখা চাই‌। এইসব ছাইপাস লিখে যে কি হবে মাথায় ঢোকে না মঞ্জিলার। বহুবার বারণ করেছে , শোনবার পাত্র নয় । লেখাতেই আনন্দ ,নেশা ,ছাপাতে নয়।
নিখিলেশ মুখে একথা বললেও সেও মনে মনে কামনা করে, প্রার্থনা করে তার লেখা কোথাও ছাপা হোক‌। ভাগ্য তার সুপ্রসন্ন নয় । মঞ্জিলারও অদৃষ্ট , শুভাকাঙ্ক্ষী লোকের অভাব ‌। কত লেখা নষ্ট হতে বসেছে। অথচ আজ পর্যন্ত একটা আগ্রহী দরদী পাঠকের স্পর্শ পড়েনি‌ সেখানে। মাঝে মাঝে গ্রামেরই দু-একজন তাচ্ছিল্যের নজরে জিজ্ঞাসা করে নতুন লেখার খবর নেই, নিখিলেশও বোঝে, তবু ভদ্রতার খাতিরে জানাতেই হয়। লোকের এইসব বিদ্রূপ মাখানো চাউনি মঞ্জিলাকেও বিরক্তি করে , বিড়ম্বিত করে । নিখিলেশকে সে কথা বললেও গায়ে মাখতে চায়না। লেখালেখি ছেড়ে স্থায়ী ইনকামের কথা ভাবলে সংসারটা অনেকটাই সচল হত । এত কষ্টে সৃষ্টে চলত না তাদের দিন। কিছুতেই হুশ হয়না। গন্ডারের চামড়ার মতই ঠেকে এখন কথাগুলো। দিনরাত অদৃষ্টের ওপর দোষ চাপানো ছাড়া মঞ্জিলার আর উপায় থাকে না ।
আজও নিখিলেশ সন্ধ্যে থেকে লিখতে বসেছে। মঞ্জিলার কোন কথায় কর্ণপাত করেনি । কিন্তু রাত যত বাড়তে লাগলো , এই উপদ্রব অসহ্য লাগলো তার । এমনিতেই লাইটের তীব্র আলোয় ঘুম আসতে চায় না কিছুতেই। তার ওপর সারাদিনের ধকলে মাথাটা ভীষন ধরেছে‌। এখন ঘুমের দরকার। তাতে মাথাটা ছাড়ে তো ছাড়বে ‌। থাকতে না পেরে এক সময় বিরক্ত প্রকাশ করেই বললে—
—–আলোটা নেভাও …
ওপাশে টেবিল থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল না। আলো নেভা তো দূরের কথা, একটা প্রতিধ্বনিও শোনা গেল না । বিছানা থেকে ঘাড়টা সামান্য তুলে অসহিষ্ণু গলায় উষ্ম প্রকাশ করেই বললে
— কি হলো ! আমার কথা কানে গেল না ? এরপর নিখিলেশের মতো সাদাসিধে ব্যক্তির পক্ষে চুপ করে থাকা আর সম্ভব নয়। স্তব্ধতার ধ্যান ভঙ্গ করে স্ত্রীর দিকে হালকা দৃষ্টিপাত করে অনুরোধের সুরে বললে
— প্লিজ আর একটু —
মঞ্জিলার কন্ঠে সেই তীব্রতারই ঝাঁঝ ।
—- না, এখনই বন্ধ করবে।
নিখিলেশ স্ত্রীর এ গলার স্বর চেনে , তাই দ্বিতীয় বার অনুরোধ করার সাহস পেল না। অগত্যা হাতের লেখাটা অসমাপ্ত রেখে, লাইট অফ করে
বিছানায় এসে বসলো।
— মাথাটা ছাড়েনি ? মঞ্জিলা স্বামীর দিকে এক ঝলক দৃষ্টি বুলিয়ে হালকা কটাক্ষ করলে
তাও সই– খবর নেওয়ার সময় হল ।
নিখিলেশ কি জবাব দেবে অন্ধকারে হাতরে বেড়ালো। সেরকম কিছু না পেয়ে বললে
— মাথা টিপে দেব ?
মঞ্জিলা পাশ ফিরে শুতে শুতে গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলে
— থাক এ তোমার গল্পের নায়িকা পাওনি ।
নিখিলেশ আর কথা বাড়ালো না । অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিঃশব্দে শরীরটা এলিয়ে দিল বিছানায়। কয়েক সেকেন্ড একেবারেই নীরবতা। দু তরফ থেকেই কথা বলার অভিলাষ দেখা গেল না । নিখিলেশ জানে এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বে না মঞ্জিলা । তবুও উৎসাহ না পেয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে নিস্তব্ধ অন্ধকারকে সঙ্গ দিল। হঠাৎ অন্ধকারে বিস্বাদ স্তব্ধতা ভঙ্গ করে রাত্রি দশটার কথা ঘোষণা করল দেয়াল ঘড়িটা ‌‌। সঙ্গে সঙ্গে নিখিলেশের আজ ‘রাতের কথা’ মনে পড়ে গেল । রাত্রি দশটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত হয় প্রোগ্রামটা । আর দেরি করে না। টেবিলের এক প্রান্তে সংজ্ঞাহীন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা রেডিওটা চালিয়ে দিল আস্তে আস্তে। মঞ্জিলা তা লক্ষ্য করে মুখে একটা বিদ্রুপ সূচক আওয়াজ করে বললে
—-এ হলো আর এক ।
নিখিলেশ এ কথার কোন জবাব দিল না । দেবার প্রয়োজন মনে করল না । এ প্রতিদিনের একটা অঙ্গ ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাত দশটার এক মিনিটের খবর শেষ হবার পর শুরু হয়ে গেল ‘আজ রাতে’। শুরুতেই চমক দিল শ্রোতাদের। ঘোষণা করল আজ এক বিশিষ্ট জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সেটা প্রকাশ করা হবে এক গান বিরতির পর। বেজে উঠল এক পুরানো ছায়াছবির গান।
নিখিলেশ পুরানো বাংলা গান শুনতে বেশি ভালোবাসে। তাও যদি হয় পিন্টু ভট্টাচার্য, সতীনাথ তো কথাই নেই, সুরের সম্রাজ্য জালে আচ্ছাদিত থাকে তার মন ‌। স্বর্গের প্রশান্তি বিরাজ করে সারা মুখ জুড়ে। সে এক অপূর্ব অনুভূতি । আলাদা ভালোলাগা ‌। সুরের আবেশে এইভাবে তন্ময় হতে মঞ্জিলা এর আগে কাউকে দেখেনি। মঞ্জিলা অবশ্য সাদামাটা মনের মানুষ । গান টানে অত ভক্ত নয়। শুনলেও তন্ময় হয় না। পুরো গানেও মনোনিবেশ থাকে না । সংসারের কথাই ভাবতে থাকে। কিভাবে অতিকষ্টে সংসারে দুটো প্রাণের অন্ন জোগাতে হয়।
গান শেষ হতেই আমন্ত্রিত অতিথির কথা শোনানো হল। ‘আজ রাতে’ আমন্ত্রিত হয়েছেন বিশিষ্ট পরিচালক গৌতম ঘোষ । তিনি শ্রোতাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে ঘোষণা করলেন, আজ গল্প বলার আসরে আপনারা আপনাদের নিজস্ব গল্প শোনাবেন যার গল্প ভালো লাগবে তার গল্পই হবে আমার পরবর্তী ছবির কাহিনী।
তারপরেই ইন্দ্রানী তার সহজ স্বাভাবিক কন্ঠে উচ্ছ্বাসের আবেগ ভাসিয়ে ঘোষণা করল এফএম রেনবো ফোন নম্বর । মঞ্জিলা ঘুম নষ্ট করে রেডিও শোনার বিরোধী। তবুও কানে গিয়েছিল পরিচালক গৌতম ঘোষের ঘোষণা। কয়েকবার উসখুস করে একসময় বলেই ফেললে
— ফোন করবে ?
স্ত্রীর কথাটা নিখিলেশের কানে গিয়েছিলে ।কিন্তু ঠিক বোধগম্য হল না । অন্ধকারে স্ত্রীর দিকে ঘাড়টা একটু বাঁকিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞাসা করলে
–কী ?
মঞ্জিলা ভূমিকা করে না । তার সহজ-স্বাভাবিক গলায় আশার দীপ্তি মাখিয়ে বললে
— ওখানে ফোন করে তোমার একটা গল্প বলনা কেন ?
— কি হবে !
— বা–রে যদি উনার পছন্দ হয়।
নিখিলেশ অস্ফূট আওয়াজে হেসে উঠল।
— তুমি পাগল হয়েছ !
মঞ্জিলা স্বামীর কাছে সরে এলো। একটা হাত স্বামীর লোমশ বুকের ওপর আলতো ভাবে স্পর্শ করে বললে
— কারুর না কারুর তো পছন্দ হবে।
নিখিলেশ তার বুকের উপর রাখা স্ত্রীর হাতের উপর নিজের একটা হাতের আলতো ছোঁয়া দিয়ে বললে
— তাই বলে আমার।
মঞ্জিলা গুম হয়ে গেল। স্বামীর বুক থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে চুপচাপ টান মেরে পড়ে থাকে বিছানায় । ততক্ষনে বেশ কয়েকজন ফোন করে শুনিয়ে দিল তাদের গল্প । স্ত্রী এইভাবে নিস্তেজ হয়ে যাওয়ায় নিখিলেশ দমে গেল। জেগে ওঠা কষ্টটা বুকের মধ্যে চেপে হালকা সুরে বললে
— কি ব্যাপার , কিছু বলছো না, কি ভাবছো ?
মঞ্জিলা নীরবতার রেশ কাটিয়ে বেশ ভরাট গলায় বললে
— ভাবছি কাল তোমার লেখা দিয়ে উনুন ধরাবো।
নিখিলেশ বোমা ফাটার মত ফেটে পড়ল ।
–মানে !
মঞ্জিলা মুখে গাম্ভীর্য ধরা গলায় ধীর-স্থিরভাবে বললে
— মানে খুব সহজ । তোমার লেখাগুলো যখন তোমার কাছে কোনো মূল্যই নেই ,এগুলো বাড়িতে রেখে জঞ্জাল বাড়িয়ে লাভ নেই । নিখিলেশ আশ্বস্ত হয়।
— বা রে আমি কি তাই বলেছি ।
— তবে ফোন করতে চাইছ না কেন ।
এবার নিখিলেশ চুপ করে গেল। সংজ্ঞাহীন ভাবে শুয়ে থেকে রেডিওর অনুষ্ঠানে মন দিল। পরে উষ্ণ পরশ পেয়ে নিখিলেশ সজাগ হয়ে গেল ।
— কি হল চুপ করে গেলে।
নিখিলেশ স্ত্রীকে কাছে টেনে নিয়ে আর ঘন হল। মুখের কাছে মুখ রেখে বললে
— ভয় হয়।
— ভয় ?
— হ্যাঁ । যদি আমার লেখা এত বড় পরিচালকের পছন্দ না হয়। তোমার কাছে ছোট হয়ে যাব।
মঞ্জিলা স্বামীকে সান্তনা দেবার চেষ্টা করে।
— তুমি বৃথা ভেবে মরছো। সিনেমা আর গল্প আকাশ-পাতাল প্রভেদ। সিনেমা হিসাবে কোন লেখকের গল্প মনোনীত না হওয়া মানেই যে তার গল্প ভালো নয় , এমনটা কিন্তু নয়।
নিখিলেশ চুপচাপ শুনে গেল স্ত্রীর কথাগুলো। তার মন মেঘাচ্ছন্ন সূর্যের মতো বারবার একটা ভাবনা উঁকি মারে । স্ত্রী কে মুখ ফুটে বলতে পারে না । অলঙ্ঘ্য পর্বতের মত খাঁড়া হয়ে দাঁড়ায় একরাশ দ্বিধা আর সংকোচের প্রাচীর।
রেডিওটা আপন-মনে এক সুরে বেজে চলেছে । তার কথাগুলো এখন আর কারুর কানে ঢোকে না ‌। ক্লান্তিকর একঘেঁয়ে লাগে গোটা প্রোগ্রামটা। একসময় বিষাদের সুরে পূর্ণচ্ছেদ ট্রেনে নিখিলেশ স্ত্রীকে বললে
— তুমি বিশ্বাস করো আমি লেখক।
মঞ্জিলা সহসা জবাব দিতে পারল না। নিজেকে অপ্রস্তুত বোধ করল । অন্ধকারে জেগে থাকা মজিলার অপ্রস্তুত মুখে যে একটা হালকা হাসির ছটা খেলা করে গেল, বুঝতে অসুবিধা হল না নিখিলেশের। আচমকা একটা কষ্ট নিখিলেশের বুক চেপে ধরে। স্ত্রী কে দৃঢ় ভাবে আলিঙ্গন করা হাত দুটো আপনি‌ আপনি‌ আলগা হয়ে গেল।
মঞ্জিলা অনুভব করল স্বামীর কষ্ট। স্বামীর শিথিল হাতটা নিজের বুকের ওপর আলতো করে চাপিয়ে আস্তে আস্তে বললে
— কেন এ কথা জিজ্ঞেস করছ ?
নিখিলেশ স্ত্রীর বুক থেকে হাতটা সরিয়ে নিচ্ছিল, পারল না । মঞ্জিলা আরও জোরে চেপে ধরল তার হাতটা‌।
— কই বললে না তো ?
নিখিলেশ কথাটা এড়িয়ে যেতে চাইল । কুমেরুর শীতল ঠান্ডা গলায় বললে
— এমনি । মনে হল তাই।
মঞ্জিলা অনেকটা স্বগোক্তির সুরেই বললে
— এটা তোমার অমূলক ভাবনা। দিনরাত লিখছ। সাহিত্য নিয়ে পড়ে আছ । এর থেকে আর বড় প্রমাণ কি আছে ।
নিখিলেশ জবাব দিল না। টান মেরে বিছানায় পড়ে থাকে । স্ত্রীর বুকে থাকা হাতটার মধ্যেও কোন উত্তেজনা খুঁজে পেল না । ডান হাতটা তখনো স্ত্রীর শক্ত মুঠোর মধ্যে ধরা। রেডিওর সুরটা আজ বড় বিষাদময় লাগে নিখিলেশের কাছে । তার কন্ঠ বন্ধ করতে চেয়েছিল , স্ত্রী বারণ করলে। অগত্যা সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই । মঞ্জিলা স্বামীর অন্যমনস্ক ভাবটা লক্ষ্য করে । আজ যেন কোন কিছুতেই তার উৎসাহ নেই ।
— তোমাকে আজ অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে যে ?
অনেকটা সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেল। উত্তরের আশা নেই দেখে মঞ্জিলা বিছানার উপর উঠে বসল। নিখিলেশ তা লক্ষ্য করল ।
— উঠলে যে ?
— তুমিও ওঠো ।
নিখিলেশ বিষ্ময়সূচক আওয়াজ করে বললে
— কেন ?
— চলো অরিন্দমের কাছে গিয়ে ওর মোবাইলটা নিয়ে আসি।
নিখিলেশের গলায় একরাশ হতাশা।
— কি হবে ফোন করে ?
— বা রে কেউ তো জানুক তুমি লেখ ।
— তাতে লাভ ?
—দেখ এত লাভ-লোকসানের হিসাব করে জীবন চলে না। আমি বলছি তুমি এখনি যাবে আমার সঙ্গে অরিন্দমের কাছে।
— কিন্তু !
নিখিলেশ কি যেন ভাবে।
মঞ্জিলা এবার বিরক্ত হয়।
— আবার কি !
— না , আমি শুনেছি কলকাতায় ফোন করলে বিল বেশি লাগে ।
— সে যা লাগে লাগুক । অরিন্দমকে দিয়ে দেবোখন।
— অরিন্দম কি এত রাত পর্যন্ত জেগে আছে।
অরিন্দম পাশের বাড়িতে থাকে। খুব মেধাবী ছেলে । এবার বিএ ফাইনাল ইয়ার দেবে রাজ কলেজ থেকে। নিখিলেশের কথায় মঞ্জিলা জানালাটা খুলে তাকাল। অরিন্দমের ঘরের আলোটা এখনো জ্বলছে। নিশ্চয়ই জেগে আছে। পড়াশোনা করছে। স্ত্রীর পীড়াপীড়ি তে নিখিলেশ কে সাথ দিতে হল। ঠিক হল মঞ্জিলাই কথা বলবে অরিন্দমের সঙ্গে । মঞ্জিলা তাতেই সন্তুষ্ট। অরিন্দমকে ভালো করেই চেনে , কিছুতেই না করতে পারবে না। এত রাতে অরিন্দমের কাছে যেতে যা সংকোচ। স্বামীর জন্য এইটুকু বিড়ম্বনা সহ্য করতেই হবে।
তখন রাত পৌনে এগারোটা । রাত্রির সমস্ত নীরবতা ভঙ্গ করে অরিন্দমের ভেজানো দরজায় মৃদু আঘাত। অরিন্দমের ধ্যান ভঙ্গ হলো । উদ্বিগ্ন মিশ্রিত গলা
— কে ?
মঞ্জিলা সাড়া দিতে গেল কিন্তু পারল না। কিসের যেন উৎকণ্ঠায় তার গলাটা বুঝে আসে। কিছুক্ষণ পরে দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসে অরিন্দম। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভেতর থেকে এক ঝলক বিদ্যুতের আলো মঞ্জিলা কে ছুঁয়ে গেল । এত রাতে মঞ্জিলা বউদি কে তার দরজায় দেখতে পেয়ে অরিন্দম কম অবাক হয়নি। তার চোখে নেমে আসে এক রাশ ভয় মিশ্রিত শঙ্কা। কথাটা জিজ্ঞাসা করার সময় তার গলাটা কেঁপে গেল
— এ…কি ..বৌ..দি ! আপনি…এ সময়ে।
মঞ্জিলা তার প্রাথমিক সঙ্কোচ কাটিয়ে সপ্রতিভ ভাবে বললে—
— হ্যাঁ ভাই , তোমার কাছেই এলাম।
— খবর সব —-আসুন –ভিতরে আসুন —।
— না –, ঘর দিয়ে যাব না । তোমার দাদা ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে‌।
— দাদা কে ডাকুন না ।
— না , আসলে — তোমার কাছে একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি, মানে মোবাইলটা একটু—বিল যা হয় দিয়ে দেব…. আসলে একটু আর্জেন্ট …।
— ঠিক আছে — নিয়ে যান না ।
— একটু দেরি হবে কিন্তু ভাই ।
—ও… নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। রাতে আমার বিশেষ ফোন আসে না। ও আমি সকালে নিয়ে নেব ।
মঞ্জিলা আর দেরি করে না। অরিন্দমকে অনেক প্রশস্তি করে মোবাইলটা নিয়ে চলে আসে। মোবাইলটা আনার পরও নিখিলেশের দ্বিধা আর কিছুতেই কাটে না। বারবার ফোন করতে নিষেধ করে । কিন্তু মঞ্জিলা ছাড়বার পাত্রী নয়। বুকের মধ্যে কেমন যেন তীব্র উত্তেজনা । যদিও এখনো সে জানেনা স্বামী কেমন লেখে।
মঞ্জিলা নাম্বারটা ডায়াল করে । ব্যস্ত। আবার চেষ্টা করে । এবারও ব্যস্ত। আধঘন্টা ধরে চেষ্টা করার পরও লাইন ব্যস্ত রইল । লাইন না পাওয়ায় নিখিলেশের মুখে অনেকটা স্বস্তি ঝরে পড়ল । কে জানে , হয়ত তার গল্প পরিচালকের ভালোই লাগত না । মঞ্জিলা যতই বলুক, তার গল্প পরিচালকের ভালো না লাগলে চিরকাল স্ত্রীর কাছে ছোট হয়ে যেত । এর থেকে ফোনটা না লাগা ভালো।
ভাগ্য নিখিলেশকে সাথ দিল না। প্রায় আধঘণ্টা কন্টিনিউ চেষ্টা করার পর ওপাশে রিংয়ের আওয়াজে ঝড় বয়ে গেল মঞ্জিলার সারা অঙ্গে । তাড়াতাড়ি মোবাইলটা স্বামীর কম্পিত হাতে গুঁজে দিয়ে বললে
— নাও — , কথা বলো , ধরেছে ।
স্ত্রীর কথাটা কানে যেতেই নিখিলেশের হৃৎকম্পন শুরু হয়ে গেল । এতক্ষন ধরে যে গল্পটা বলবে বলে ঠিক করে রেখেছিল । এক নিমেষে সব হারিয়ে গেল । একবিন্দু আর মনে এলো না। কানের পাশে মোবাইলটা চেপে ধরে হতভম্বের মত বসে রইল বিছানায় ।
মঞ্জিলার চোখ তা এড়ালো না । ক্রমাগত অস্পষ্ট স্বরে স্বামীকে উৎসাহিত করতে লাগলো নিখিলেশ নির্বিকার । কোন পরিবর্তনের দমকা হাওয়া বয়ে গেল না তার সর্বাঙ্গে ।
অবশেষে অপর প্রান্তের হস্তক্ষেপে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ধ্বনিতে নিখিলেশের মুখে বাক্য ফুটল । প্রথমে কম্পিত দুরুদুরু বুকে, পরে গল্পের সলিল সাগরে ডুব দিয়ে ভেঙে গেল তার প্রাথমিক সংকচ আর দ্বিধার প্রাচীর ‌। গল্প বলার আসরে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করল তার গল্প ।
কিন্তু ভাগ্য তাদের বিড়ম্বিতই করলো ‌। শেষ পর্যন্ত তাদের সমস্ত প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হবার কয়েক মিনিট আগেই কারেন্ট গেল চলে। রেডিওটা আবার ফিরে গেল তার আপন স্তব্ধতায়। অনুষ্ঠান আর শোনা হলো না।
দুজনের আফসোস করা ছাড়া আর উপায় থাকে না। শেষ পর্যন্ত কার গল্প পরিচালকের ভালো লাগলো আর কোন ভাবেই জানার উপায় রইল না। দুজনে বিছানায় আশ্রয় নিল ‌। কারুর চোখে ঘুম নেই। দুজনকে চিন্তার কালো থাবা গ্রাস করলো।
এর এক সপ্তাহ পর , অপ্রত্যাশিত ভাবে একটা রেজিস্ট্রি চিঠি এলো নিখিলেশের কাছে । চিঠিটা এসেছে কলকাতা টালিগঞ্জ থেকে । নিখিলেশ দ্বিধাগ্রস্ত। চিঠি ভুল করে চলে আসেনি তো। শেষ পর্যন্ত চিঠিটা খুলতেই হলো স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে। চিঠিটা শেষ করা মাত্র চন্দ্রালোকিত রুপালি আলোর মতো নিখিলেশের মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। এক মনোরম প্রশান্তির দীপ্তি বয়ে গেল তার সারা শরীর জুড়ে । তবু বিশ্বাস করতে সাহস হয় না। এত বড় অভাবনীয় আনন্দের খবর কি সহজে বিশ্বাস করা যায় ‌। চিঠিটা এসেছে পরিচালক গৌতম ঘোষের কাছ থেকে । সেদিন গল্প বলার আসরে তার গল্পই নাকি পরিচালকের ছবি করার উপযুক্ত বলে মনে হয়েছে । তাই এই চিঠি। গল্পটা তিনি কিনে নিতে চান তার পরবর্তী ছবির জন্য। গল্পের কাহিনী পরিচালকের ভীষণ মনে ধরেছে ।
মঞ্জিলাকে বলতে আকাশ থেকে পড়ে। এতদিন স্বামীকে সে চোখে দেখেনি । আজ নিখিলেশ তার বুকে অনেকটা জায়গা দখল করে নিল। স্বামীর জন্য গর্ববোধ হল। নিখিলেশ চিঠিটা খামে পুরতে পুরতে মঞ্জিলার দিকে এক ঝলক‌ দৃষ্টি বুলিয়ে বললে
— উনি চাইছেন আমি শীঘ্র কলকাতা গিয়ে উনার হাতে গল্পের কপিটা তুলে দিই । অবশ্য উপযুক্ত মূল্য নিয়ে।
মঞ্জিলা স্বামীর কাছে সরে আসে । আজ সে ভীষণ খুশি।
— কবে যাচ্ছো তুমি ?
স্ত্রীর এই আনন্দের চাউনি নিখিলেশের চোখ এড়িয়ে গেল না । নিখিলেশ স্ত্রীর পুলকিত মুখের দিকে চেয়ে বললে
— দেখি কবে যেতে পারি।
শেষপর্যন্ত আজ যাব কাল যাব করেও নিখিলেশের আর কলকাতা যাওয়া হল না। এর মধ্যে নিখিলেশ প্রচণ্ড অসুখে পড়ল । টানা দুই সপ্তাহ। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারল না । স্ত্রীর অক্লান্ত সেবাযত্নে নিখিলেশ নতুন করে জীবন ফিরে পেল। এখনো শরীরের স্বাভাবিকত্ব ফিরে আসেনি । হাটতে গেলে শরীরটা দুরদুর করে। খাওয়াতেও অরুচি । নইলে নয় তাই খেতে হয়।
এইরকম অবস্থায় নিখিলেশ খবর পেল কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে লোক এসেছে তার সঙ্গে দেখা করতে। খবরটা প্রথম দিল তিন বছরের অরিত্র। সম্পর্কের ভাইপো । একগাল হাসি নিয়ে হরিণ শাবকের মতো ছুটতে ছুটতে হাঁপাতে হাঁপাতেই বললে –
— কা…কু — কা..কু তোমাদের বাড়িতে লোক আসছে।
নিখিলেশ শরীরে বেশ জোর পাচ্ছিল না। তাই বিছানাতে শুয়ে ছিল । বিছানা থেকে মুখ তুলে তাকিয়ে বললে
— কে আসছে অরি বাবু ?
অরিত্র তার কচি ডালের মত ছোট দুটি হাতের সাহায্যে বিস্ময় প্রকাশ করে বললে
— মস্ত বড় গাড়ি , ভদ্রলোক।
কথাটা শুনামাত্র নিখিলেশ বিদ্যুৎচমকের মত বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ক’দিন ধরে মনের মধ্যে এই ভাবনাটাই ঘুরে ফিরে আসছিল । শেষ পর্যন্ত বাড়ি না এসে পরে। পরে নিজের মন কে শান্তনা দেয়। এই তুচ্ছ গল্পের জন্য নিশ্চয় বাড়িতে হানা দেবে না। কিন্তু অরি বাবুর মুখে কথাটা শোনার পর সেই ভাবনাটা আরো একবার ছুঁয়ে গেল তার মন । তবে কি সত্যি তিনি আসছেন। অরি বাবুর হাত ধরে বাইরে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলো কয়েক জন অপরিচিত ভদ্রলোক ।
নিখিলেশের বাক্যরোধ , কথা বলার ভাষা পর্যন্ত গেছে হারিয়ে । এগিয়ে এসে আলাপ করল আগন্তুকদের একজন ।
— আপনি নিখিলেশ ?
নিখিলেশ সহসা কথা বলতে পারলো না । মৃদু ঘাড়টা নাড়ল । আলাপি ভদ্রলোক তখন আর একজন ভদ্রলোকের দিকে দৃষ্টি রেখে বললে
— উনি পরিচালক গৌতম ঘোষ , আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন ।
নিখিলেশ নির্দেশিত লোকটার দিকে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলো । তার বিশ্বাসই হচ্ছে না এত বড় মাপের পরিচালক তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
কথাবার্তা বিশেষ হলো না। কিছু মামুলি কথা বার্তার পর পরিচালক তার গল্পটা কিনতে চাইলেন উপযুক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। নিখিলেশ নিতে রাজি হলো না । অত বড় পরিচালক তার গল্প পছন্দ করেছে আবার টাকা! কিন্তু পরিচালক নাছোরবান্দা । নিখিলেশের হাতে দশ হাজার টাকা জোর করে গুজে দিল। যাবার সময় বারবার শুটিং দেখতে যাবার কথা বলে গেলেন । শুটিং শুরুর যথাসময়ে অবশ্য খবর দেবেন ।
এই প্রথম নিখিলেশের মনে হলো সে একজন লেখক । মনে মনে অনেকটা স্বস্তি পেল। এই ঘটনার পর পাড়ার লোকের কাছে নিখিলেশের অনেকটা সম্মান বেড়ে গেল । অনেকে তাকে সমীহের চোখে দেখতে থাকে। স্ত্রী মঞ্জিলার তো কথাই নেই। এত বড় সম্মান সে জীবনে কখনো পায়নি ।
দু’মাস প্রায় গত হয়েছে । সবার মনে পুরনো স্মৃতিগুলো ভাটা পড়ে এসেছে । এমন সময় নিখিলেশ পরিচালকের কাছ থেকে চিঠি পেল ।তার গল্প নিয়ে পরিচালক গৌতম ঘোষ যে ছবি করার কথা বলেছিল তার প্রথম শুটিং সামনের সপ্তাহে। নিখিলেশকে বারবার রিকোয়েস্ট করেছে শুটিং দেখতে যাবার জন্য । কিন্তু একটা মিথ্যা অজুহাত দিয়ে নিখিলেশ এড়িয়ে গেল সেই অনুরোধ। সেখানে গিয়ে কি হবে। শুটিং এর ভালো মন্দ তো কিছুই বোঝে না । তাছাড়া সেখানে কত সব ভালো ভালো লোক থাকবে , তাদের কাছে নিজেকে বড় বিব্রত বোধ করবে। তার চেয়ে না যাওয়াই ভালো । মঞ্জিলা অবশ্য অনুরোধ রাখার কথাই বলেছিল । অত বড় মানুষের কথা না রাখা মানেই তাকে ছোট করা ,অপমানিত করা । তাতেও কাজ হয়নি। নিখিলেশ যে কথাটা বোঝে না তা নয়, তার মত সামান্য লোক অত বড় মাপের মানুষের সামনে দাঁড়াতেই যা অনীহা । অত বড় পরিচালক তার মত লোকের গল্প নিয়ে সিনেমা করছে এই তার পরম সৌভাগ্য । জীবনে অনেক কিছুই পাওয়া ।
তবু শেষ পর্যন্ত পরিচালকের সব অনুরোধ নিখিল প্রত্যাখ্যান করতে পারল না। প্রায় এক বছর হবে । হঠাৎ গাড়ি নিয়ে হাজির হল পরিচালকের কয়েক জন সঙ্গী। এবার অনুরোধ রাখতেই হবে। শুটিং শেষ। এ মাসের পনের তারিখে ছবিটা রিলিজ হবে । পরিচালকের ইচ্ছে এক সঙ্গে ছবিটা ঐ দিন দেখবে। এ ছবি যে ভীষণ সাড়া ফেলবে তাতে পরিচালকের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
নিখিলেশ ভীষণ উৎসাহিত ‌। তার সারা শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। মুখে সদ্য ফোটা ফুলের দীপ্তি ছড়িয়ে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল ‌। তার গল্প নিয়ে ছবি কত লোক দেখবে , তার না দেখলে হয় । এক বছর ধরে এই দিনটার জন্যই অপেক্ষা করেছিল।
পরিচালকের কথামতো ছবিটা যদি সত্যিই সাড়া ফেলে , কত নাম জুটবে তার , কত লোক অভিনন্দন জানাবে। ভাবলেই নিখিলেশের সারা শরীরে শিহরণ বয়ে যায়।
মঞ্জিলার আনন্দ কিছু কম নয় । যতই হোক স্বামীর সুখ-দুঃখের সমান অংশীদার ।
নির্দিষ্ট দিনে শেষ পর্যন্ত মঞ্জিলার আর যাওয়া হলো না । ছোট ভাই পড়ে গিয়ে একটা হাত ভেঙে ফেলেছে। কাঁদতে কাঁদতে সেখানেই ছুটল। নির্দিষ্ট দিনে নিখিলেশকে একাই যেতে হল কলকাতায়। কলকাতার স্টার থিয়েটার হলে আজ তাঁর গল্পের ছবি মুক্তি হবে । শুধু কলকাতা নয় আরও বড় বড় কয়েকটা শহরে মুক্তি পাবে সেই ছবি । মনের ভেতর আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে নিখিলেশ যখন পৌঁছালো, দেখল পরিচালক গৌতম ঘোষ ও তার লোকজন এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন তার জন্য ‌ । কয়েকটা মামুলি কথাবার্তার পর তারা গিয়ে বসলো অন্ধকারে জমাট বাঁধা সিনেমা হলে।
সিনেমা হল তখন ভিড়ে ঠাসা। সবার মধ্যে একটা কৌতুহল স্রোত । ছবিটা কেমন হবে ।
কয়েক মিনিট ধরে একটা চাপা টেনশন আর বুক ভরা উত্তেজনা নিয়ে বসে থাকার পরে নিখিলেশের ধৈর্য্যের পরিসমাপ্তি হল। বড় বড় অক্ষরে শুরু হল কাস্টিং । নিখিলেশের চোখ যেন প্রতিটি নাম গিলে খেতে চাই । বুকের ভিতরটা হৃদপিন্ডটা মৃদু আওয়াজ করে সেই যে লাফাতে শুরু করেছে এখনো থামবার লক্ষনই নেই। সে একটা কথাই বলতে চাই কখন আসবে তার নাম। কখন দেখবে তার নাম। প্রতিটি সেকেন্ড যেন তার কাছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর । অচিরেই সাক্ষাৎ হলো তার নাম । কাহিনীকারের জায়গায় বেশ গোটা গোটা অক্ষরে তার নাম লেখা রয়েছে। নিজের নাম সিনেমার পর্দায় এই ভাবে দেখা যে এক আশ্চর্য অভিব্যক্তি। জন্মের আনন্দের দ্যূতি যেন ঝরে পড়ল সেই মুহূর্তে। নিখিলেশের সারা মন প্রশান্তিতে ভরে যায় ।
নিখিলেশের দুচোখ মুগ্ধ হয়ে বুঝে আছে শুভক্ষণে‌। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না আনন্দের রেশ । ছবি দেখতে দেখতে দুচোখ জলে ভরে আসে। সে কি দেখছে ! গল্পের চরিত্রগুলোকে তার এত অচেনা লাগছে। মনে হল ভিনগ্রহের বাসিন্দা। এই রকম গল্প তো সে লেখেনি ‌। অথচ চরিত্রগুলো তার চেনা। ভীষণভাবেই জানা । একটা ভয়ঙ্কর কষ্ট, একটা ভীষণ জ্বালা গভীর ভাবে চেপে ধরল নিখিলেশের মন । তার গল্পটা এমন নিষ্ঠুর ভাবে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করা হয়েছে । নির্মমভাবে গল্পটা বদলে দেয়া হয়েছে‌। নিখিলেশ আর পর্দার দিকে তাকাতে পারে না । চোখ ফেটে এল জলে।
যেন মর্গে থেকে নিয়ে আসা এক আপন জনের মৃতদেহ । শরীর জুড়ে পোস্টমর্টেমের মোটা মোটা সেলায়ের রেখা। আর ঐ বিছানার দৃশ্যটা । স্বপ্নেও ভাবেনি সে ‌, পরিচালক এরকম নিষ্ঠুর বীভৎসভাবে দেখাবে ‌। আর এক মিনিট হলে বসে থাকতে ইচ্ছে করছিল না । অথচ পালিয়ে আসা যায় না ‌‌। অত বড় পরিচালককে অপমান করা হবে।
নিখিলের চোখ বুজে পড়ে থাকে । প্রতিটি মিনিট গুনে চলে আপন মনে ।
প্রথম দিনের সেই আলাপি ভদ্রলোক এতক্ষণ নিখিলেশকে লক্ষ্য করছিল । বুঝতে পারল তার কষ্ট । নিখিলেশের হাতে মৃদু চাপ দিয়ে মাথাটা নিচু করে, যথাসম্ভব নিচু গলায় বললে
— কিছু মনে করবেন না। দর্শকের কথা মাথায় রেখে একটু-আধটু গল্প বদলাতে হয়েছে ।
নিখিলেশ মাথা দুলিয়ে তাকে সম্মতি জানালো। কোনোক্রমে আড়াই ঘন্টা কাটিয়ে ছবিটা যখন শেষ হলো, তখন নিখিলেশের বেদনায় ভরা থমথমে মুখ । চোখ দুটো রক্ত জবার মতো লাল টকটকে ।
পরিচালক প্রথমে অভিনন্দন জানাল নিখিলেশ কে । তার থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে বললে
— আপনাকে ধন্যবাদ , এত সুন্দর গল্প উপহার দেওয়ার জন্য ।
নিখিলেশ পরিচালকের দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসল। কোন কথাই বললে না ।
ততক্ষণে মিডিয়াতে প্রচার হয়ে গেছে এ ছবির শ্রেষ্ঠত্বের কথা। স্টার থিয়েটার হলের সামনে তখন রিপোর্টারের জোয়ার। পরিচালক হল থেকে বের হতেই এক ঝাঁক রিপোর্টার ঘিরে ধরল তাকে। সকলে জানতে চাইল এই ছবি নির্মাণের ইতিহাস।
পরিচালক কিছু ভাসা ভাসা উত্তর দিয়ে বললেন
— আজ আমাদের সামনে সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব , যার জন্য আপনাদের এত সুন্দর ছবি উপহার দিতে পারলাম ।
রিপোর্টাররা উৎসুক। সকলের মুখে কৌতুহল, কে সেই ব্যক্তি ।
এরপর পরিচালক গৌতম ঘোষ নিখিলেশকে দেখিয়ে বললেন
— উনি … সেই ব্যক্তি, আমার ছবির কাহিনীকার‌ ।
শোনা মাত্র রিপোর্টাররা নিখিলেশকে ছেঁকে ধরলো।
নিখিলেশ ভীষন বিব্রত বোধ করল । একবার ভিড়ে ঠাসা জনতার দিকে তাকিয়ে বললে
— আপনারা ভুল শুনেছেন , এ ছবির গল্প আমার নয়। পরিচালকের নিজেরই‌।
রিপোর্টাররা থ । বুঝতে পারেনা প্রকৃত সত্য।
পরিচালক অবাক বিস্ময়ে এগিয়ে এল নিখিলেশের কাছে।
— এ আপনি কি বলছেন ! নিজের গল্পকে—
নিখিলেশ হালকা হাসির চেষ্টা করলে। মোলায়েম সুরে বললে
— আসলে গল্পটা আপনারই।
তারপর পকেট থেকে দশ হাজার টাকার বান্ডিল বের করে পরিচালকের হাতে গুঁজে দিয়ে বললে
— এটা আর আমি নিতে পারব না ।
পরিচালক কিছু বলতে গেল, ততক্ষণে নিখিলেশ রিপোর্টারদের ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত হয়ে নেমে পড়েছে কলকাতার রাস্তায়। রিপোর্টাররা আবার ঘিরে ধরেছে পরিচালককে । তাদের হালকা হালকা কথা গুলো ভেসে আসছিল নিখিলেশের কানে।
নিখিলেশ তখন প্রশস্ত চিত্তে হেঁটে চলে কলকাতার সাধারণ মানুষের ভিড়ে।

 

 

কীভাবে লেখা পাঠাবেন?
নীচে উল্লিখিত হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার কিংবা ইমেল আইডিতে লেখা পাঠাতে পারবেন।
হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার~ 9635459953
ইমেল আইডি~ bengalliveportzine@gmail.com
লেখার সঙ্গে নিজের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং একটি ছবি পাঠানো আবশ্যক।
ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে নিজের তোলা দুটো ছবি পাঠাতে হবে।

Related News

Leave a Reply

Back to top button