পোর্টজিন

জীবনানন্দ দাশ’র ‘কবিতার কথা’ , কবির মনোবীজ – সুমন ব্যানার্জি

Bengal Live পোর্টজিনঃ পোর্টজিন কি? পোর্টজিন একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। প্রতি সপ্তাহের রবিবার এটি বেঙ্গল লাইভের (bengallive.in) এর পোর্টজিন বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয়।

suman banerjee bengal live portzine

১. কবি হিসাবে মৃত্যুত্তর পর্বে তিনি কিংবদন্তি। কিন্তু গদ্যকার হিসাবে তাঁর চর্চা ও মূল্যায়ন হয়েছে কতটুকু ? উপন্যাস ও ছোটগল্পে তো বটেই প্রবন্ধ,নিবন্ধ বা মননশীল গদ্যে তিনি প্রাতিস্বিকতার ছাপ রেখে গেছেন।কবি হিসাবে তিনি যেমন অনন্য ঠিক তেমনই গদ্যকার হিসাবেও তিনি অনন্যপরতন্ত্র।ভাবনা ও আঙ্গিক দু’দিক থেকেই তাঁর গদ্য অভিনব।

 জীবনানন্দ দাশ’র লেখা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গদ্য গ্রন্থ “কবিতার কথা” নিয়েই এখানে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করার চেষ্টা করব।১৩৪৫ – ১৩৬০ বঙ্গাব্দের মধ্যে লেখা মোট ১৩টি প্রবন্ধ এই বইতে গ্রন্থিবদ্ধ হয়েছে। সাবজেক্টিভিটি (বিষয়ীগত) ও অবজেক্টিভিটি (বিষয়গত বা নৈর্ব্যক্তিক) দুই ধরণের লেখা এবং ভাবনারই মিশ্রণ ঘটেছে লেখাগুলির মধ্যে।এইসব লেখার মধ্যেই কবি ছড়িয়ে রেখেছেন মনোবীজগুলিকে : এই মনোবীজ বস্তত সৃষ্টিশীল মনের দর্শন। এখানে আমরা মোট চারটি প্রবন্ধকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখব যথা — ‘কবিতার কথা’ ,’রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা’, ‘দেশ,কাল ও কবিতা’।

২. ‘কবিতার কথা’ শীর্ষক লেখার প্রথমেই যে কথাগুলি লিখেছিলেন সেগুলি কার্যত প্রাবাদিক মর্যাদা পেয়েছে —

“সকলেই কবি নয়।কেউ কেউ কবি ; কবি — কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং আধুনিক জগতের নব নব কাব্য-বিকিরণ তাদের সাহায্য করছে।”

আসলে এই কথাগুলি যে কোন মহৎ স্রষ্টার ক্ষেত্রেই অনড় সত্য।প্রথমত কবি সেই যাঁর মধ্যে রয়েছে কল্পনা।কল্পনাই উদ্দীপিত করে সৌন্দর্যের আকাঙ্ক্ষাকে।কারণ দুরবগাহ কল্পনা শক্তি বলেই কবি পারেন বাস্তবকে অতিক্রম করতে, দূরকে কাছের করে নিতে এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করতে। দ্বিতীয়ত তাঁর মধ্যে থাকতে হবে ‘চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা’ এটা একজন কবিকে অন্যজন কবির থেকে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে।যেমন – রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা ভিন্ন।কাজেই দু’জন কবিকে আলাদা করে চিনতে সমস্যা হয় না। তৃতীয়ত তিনি বললেন যে, পশ্চাতে বিগত অনেক শতাব্দীর প্রভাব ও আধুনিক পৃথিবীর নব নব কাব্য বিকিরণ কবির মনোজগতকে পরিপ্লাবিত করে। অর্থাৎ কবি বা স্রষ্টা আকাশ থেকে এসে পড়ে না। তিনি এই মানববিশ্বেরই একজন।কবি হয়ে ওঠা আসলে একটি প্রক্রিয়া।যা অনেক দিক থেকে চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে। একজন কবি কখন নিজেকে বিযুক্ত করতে পারেন না বিগত শতাব্দীর চিন্তার ও সংস্কৃতির ইতিহাসের প্রবাহ থেকে। কবি লিখছেন যে —

” ‘আছে আছে আছে’ এই বোধির ভিতরে চলেছে / নক্ষত্র, রাত্রি, সিন্ধু, রীতি, মানুষের বিষয় হৃদয় ; / জয় অস্তসূর্য, জয়, অলখ অরুণোদয়, জয়।” ( সময়ের কাছে , সাতটি তারার তিমির)

    কবি নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন এই কল্পনার আভা কোথা থেকে আসে ? এই বিরাট পৃথিবী,নিসর্গলোক ও মহাকাশে অবিরত শুধু দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে।একজন সংবেদী স্রষ্টার মনের সুগভীরে তা তৈরি করে তুমুল আলোড়ন।তা কোন নির্দিষ্ট সময় বা ক্ষণ ধরে আসে না, স্থান-কাল পাত্র সেখানে তুচ্ছ হয়ে যায়।কবি পারেন সেই অনুভূতিকে ভাষায় মূর্ত করতে। তাঁর নিজস্ব দৃষ্টি তাঁকে সকলের চেয়ে আলাদা করে দেয়। জীবনানন্দ কাব্যঘন ভাবে তা বিবৃত করলেন —

“কারণ আমাকে অনুভব করতে হয়েছে যে, খণ্ড-বিখণ্ডিত এই পৃথিবী, মানুষ ও চরাচরের আঘাতে উত্থিত মৃদুতম সচেতন অনুনয়ও এক এক সময় যেন থেমে যায়, — একটি-পৃথিবীর-অন্ধকার-ও-স্তব্ধতায় একটি মোমের মতন জ্বলে ওঠে হৃদয়, এবং ধীরে ধীরে কবিতা-জননের প্রতিভা ও আস্বাদ পাওয়া যায়।”

কল্পনায় উদ্বেলিত কবি হৃদয় যেন মোমের মতনই জ্বলে ওঠে।

    বস্তুত কবিতা ও পদ্য এক নয়।বলা যেতে পারে যে সব কবিতাই পদ্য কিন্তু সব পদ্য কবিতা নয়।পদ্যের আবেদন ক্ষণিকের,তার ব্যঞ্জানাও খুব প্রবলভাবে মানুষের মনোলোকে ধাক্কা দেয় না শুধু একরকমের নিখাদ সুখ ও মজা দেয়।পদ্যের মধ্যে এক রকমের স্লোগানধর্মীতা রয়েছে।পদ্যের মধ্যে দিয়েই বেশিরভাগ লোকশিক্ষা,ধর্মীয় বা নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু কবিতার এইসব দায় নেই। হ্যাঁ কবিতাও বৃহত্তর অর্থে নৈতিক শিক্ষা দেয় বটে কিন্তু সেটাই তার মুখ্য লক্ষ্য নয় এবং তা হতেও পারে না।কবিতার মূল লক্ষ্য সূক্ষ্ম অনুভূতিকে জাগ্রত করা,রস সৃষ্টি করা, চিন্তা ও চেতনার জগতে সুদূরপ্রসারী অভিঘাত সৃষ্টি করা।এটাই কবিতাকে সবকিছুর থেকে আলাদা করেছে।আরিস্ততল যেমন বলেছিলেন যে – কবিতার স্থান দর্শন ও ইতিহাসের থেকে অনেক উঁচুতে। জীবনানন্দের উপলব্ধি —

“এই চমৎকার অভিজ্ঞতা যে সময় আমাদের হৃদয়কে ছেড়ে যায়, সে সব মুহূর্তে কবিতার জন্ম হয় না, পদ্য রচিত হয়, যার ভিতর সমাজ-শিক্ষা, লোকশিক্ষা, নানা রকম চিন্তার ব্যায়াম ও মতবাদের প্রাচুর্যই পাঠকের চিত্তকে খোঁচা দেয় সবচেয়ে আগে এবং সবচেয়ে বেশি করে ; কিন্তু তবুও যাদের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী, পাঠকের মন কোনো আনন্দ পায় না, কিংবা নিম্নস্তরের তৃপ্তি বোধ করে শুধু…।”

      কবিতা আসলে তৈরি করে এক বিকল্প বাস্তবকে।শিল্প তো সেটাই জীবনে যা হলেও হতে পারতো।কবিতা পারে বাস্তব থেকে উপাদান নিয়েই অতিবাস্তব বা পরাবাস্তব কিছু সৃজন করতে। জীবনানন্দ কথিত ‘কল্পনা মনীষা’ শব্দবন্ধটি আশ্চর্যরকম সুন্দর ও ব্যঞ্জানাঋদ্ধ।বলা বাহুল্য যে তিনি নিজেও কল্পনা-মনীষা বা প্রতিভার অধিকারী ছিলেন —
“কবিতা ও জীবন একই জিনিসেরই দুই রকম উৎসারণ ; জীবন বলতে আমরা সচরাচর যা বুঝি তার ভিতর বাস্তব নামে আমরা সাধারণত যা জানি তা রয়েছে, কিন্তু এই অসংলগ্ন অব্যবস্থিত জীবনের দিকে তাকিয়ে কবির কল্পনা-প্রতিভা কিংবা মানুষের ইমাজিনেশন সম্পূর্ণ ভাবে তৃপ্ত হয় না ; কিন্তু কবিতা সৃষ্টি করে কবির বিবেক সান্ত্বনা পায়, তার কল্পনা-মনীষা শান্তি বোধ করে, পাঠকের ইমাজিনেশন তৃপ্তি পায়।”

তিনি আরও লিখেছেন যে —

“পৃথিবীর সমস্ত জল ছেড়ে দিয়ে যদি এক নতুন জলের কল্পনা করা যায় কিংবা পৃথিবীর সমস্ত দীপ ছেড়ে দিয়ে এক নতুন প্রদীপের কল্পনা করা যায় — তাহলে পৃথিবীর এই দিন, রাত্রি, মানুষ ও তার আকাঙ্ক্ষা এবং সৃষ্টির সমস্ত ধুলো সমস্ত কঙ্কাল ও সমস্ত নক্ষত্রকে ছেড়ে দিয়ে এক নতুন ব্যবহারের কল্পনা করা যেতে পারে যা কাব্য ; — অথচ জীবনের সঙ্গে যার গোপনীয় সুড়ঙ্গ-লালিত সম্পূর্ণ সম্বন্ধ ; সম্বন্ধের ধূসরতা ও নূতনতা।”

    আসলে কবিতা কখন জীবনের সঙ্গে তার সম্বন্ধকে ছিন্ন করে না। বরং জীবনকেই আরও ভালোবাসতে শেখায়, আরো নিবিড়ভাবে জীবনের থেকে ও মানব-পৃথিবী থেকে উষ্ণতাকে দু’হাত ভরে নিতে শেখায়।কাব্য জীবনের সঙ্গে সংসক্ত। তাঁর একটি চমৎকার কবিতার কথা মনে পড়ে —

“আমরা অন্তিম মূল্য পেতে চাই –প্রেমে ; / পৃথিবীর ভরাট বাজার ভরা লোকসান / লোভ পচা উদ্ভিদ কুষ্ঠ মৃত গলিত আমিষ গন্ধ ঠেলে / সময়ের সমুদ্রকে বার-বার মৃত্যু থেকে জীবনের দিকে যেতে বলে।” (পৃথিবীতে এই)

বিশ্বপ্রকৃতির অফুরন্ত মধুরিমা, অনির্বচনীয় সৌন্দর্য হৃদয়ে বিচিত্র অনুভূতির খেলা শুরু করে , নীহারিকা যেমন নক্ষত্রের আকার ধারণ করে তেমনই কবি হৃদয়ে ধীরে ধীরে বস্তু সংগতি লাভ করে অনুভূতিমালা —

“এই সমস্ত জিনিসই অনেকদিন থেকে প্রতিফলিত হয়ে কোথায় যেন ছিল ; এবং ভঙ্গুর হয়ে নয়, সংহত হয়ে, আরো অনেকদিন পর্যন্ত, হয়তো মানুষের সভ্যতার শেষ জাফরান রৌদ্রলোক পর্যন্ত, কোথাও যেন রয়ে যাবে ; এই সবের অপরূপ উদগীরণের ভিতর এসে হৃদয়ে অনুভূতির জন্ম হয়, নীহারিকা যেমন নক্ষত্রের আকার ধারণ করতে থাকে তেমনি বস্তু-সঙ্গতির প্রসব হতে থাকে যেন হৃদয়ের ভিতরে ; এবং সেই প্রতিফলিত অনুচ্চারিত দেশ ধীরে ধীরে উচ্চারণ করে ওঠে যেন, সুরের জন্ম হয়, এই বস্তু ও সুরের পরিণয় শুধু নয়, কোনো কোনো মানুষের কল্পনা-মনীষার ভিতর তাদের একাত্মতা ঘটে — কাব্য জন্ম লাভ করে।”

     নিজের ভিতরের ছবিটিকেই তুলে ধরছেন কবি।কখন মাটির পৃথিবীর ভাটফুল,বাসক,ফণী মনসা,পদ্মের দিঘী,শঙ্খচিল, ছিন্ন খঞ্জনা কখন বেরিলমণির তরঙ্গে, ভূমধ্যসাগর ,মালয় সমুদ্র থেকে সুদূর নক্ষত্রলোক — সব কিছুই ধরা দিয়েছে তাঁর চিন্তাবিশ্বে।স্থানিক সময় থেকে অনন্ত সময়কে যিনি ছুঁতে চেয়েছেন তিনিই লিখতে পারেন—

“তিনি প্রকৃতির সান্ত্বনার ভিতরে চলে যাবেন — শহরে বন্দরে ঘুরবেন — জনতার স্রোতের ভিতর ফিরবেন — নিরালম্ব অসঙ্গতিকে যেখানে কল্পনা-মনীষার প্রতিক্রিয়া নিয়ে আঘাত করা দরকার নতুন করে সৃষ্টি করবার জন্যে সেই চেষ্টা করবেন ; আবার চলে যাবেন, হয়তো উন্মুখ পঙ্গুদের সঙ্গে করে নিয়ে, প্রকৃতির সান্ত্বনার ভিতর ; সেই কোন আদিম জননীর কাছে যেন, নির্জন রৌদ্রে ও গাঢ় নীলিমার নিস্তব্ধ কোনো অদিতির কাছে।”

যাঁর মধ্যে এমন অনুভূতি কাজ করে তিনিই লিখতে পারেন —

“হে পাবক, অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি, অন্ধকারে / তোমার পবিত্র অগ্নি জ্বলে।” (মাঘসংক্রান্তির রাতে)

“হে আকাশ, হে প্রতিভা, হে বিচিত্র উচ্ছ্রিত সূর্যের উজ্জ্বলন / আমাদের রোগ,পাপ,বয়সের রূঢ় মরুভূমি / শেষ করে সৃজনের অনাদির দীপ্তিকে আদিম / চুম্বনে বিজ্ঞান, প্রেম, প্রেমাগ্নি উড্ডীন করো তুমি।”

২.
   বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন যে — আশা-নিরাশা,প্রতিবাদ,বিদ্রোহ,সংশয়,ক্লান্তি,অন্তর্মুখিনতা-বহির্মুখিনতা, জীবন-সংগ্রাম,আত্মিক তৃষ্ণা ইত্যাদি সমস্ত কিছুকেই খুঁজে পাওয়া যাবে শুধু ভিন্ন ভিন্ন কবিতাতে নয়, হয়তো বিভিন্ন সময়ে একই কবির রচনায়।মুখ্যত তিরিশের দশক থেকেই বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি নতুন প্রবণতা অঙ্কুরিত হচ্ছিল তা হল — আধুনিকতা। বস্তুত দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী বিশ্বের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত লয়ে বদলাচ্ছিল যার অনিবার্য অভিঘাত এসে পড়ে সাংস্কৃতিক দুনিয়াতেও।প্রেম, প্রকৃতি ও ঈশ্বর নির্ভর চিরায়ত রোম্যান্টিক ধ্যান ধারণার ভিত্তিমূলে একটা আঘাত আসছিল।সেইসময় বাংলা কবি সাহিত্যিকদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের প্রভাববলয় থেকে মুক্ত হয়ে নতুন ভাবনা ও জীবনদর্শনের স্ফুরণ ঘটানো। ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীই এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে প্রমুখ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন একটি নতুন পরিসর।একদিকে বদলে যাওয়া মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবন, নৈঃসঙ্গ্য বোধ,অনিকেত মনোবৃত্তি,যৌনতা,দারিদ্র শোষণ তথা সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ছবি সেই সময়ের সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি করে প্রতিকায়িত হয়েছিল।

    জীবনানন্দ দাশের লেখালেখির শুরু এই সময় থেকেই।এই বিশেষ ঐতিহাসিক সময়কালকে, বদলে যাওয়া সময়ের ছবিটিকেই তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর প্রবন্ধ ‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা’-তে —

“রবীন্দ্রনাথের কবিতার চর্চা আধুনিক বাঙালী কবির তেমন মন যোগাত না ; অন্তত যারা আধুনিক বিশিষ্ট বাঙালী কবি রবীন্দ্রনাথকে তারা বিস্পষ্ট সম্ভ্রমে প্রণাম জানিয়ে মালার্মে ও পল ভারলেন, রঁসার ও ইয়েটস ও এলিয়ট-এর সদর্থক বা নঞর্থক মননবিচিত্রতার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।”

  সেই যুগের তরুণ কবিদের কাছে টি,এস,এলিয়ট এক নতুন পরিসরের সন্ধান দিয়েছিল। তাঁর লেখা ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ সে যুগে সবচেয়ে বহুল চর্চিত হয়ে ওঠে।এই পোড়া জমি আধুনিক সমাজ ও সভ্যতার প্রতীকী রূপ। কিন্তু জীবনানন্দের পর্যবেক্ষণ ছিল যে এই ধরণের লেখায় রয়েছে সমকালীনতার ছাপ , চিরকালীনতার নয়।কাজেই কালের অমোঘ নিয়মেই তার গুরুত্ব একটা সময়ে লঘু হয়ে যাবে।একে ঠিক আধুনিক বলাটা অমূলক হবে —

“কাব্যকে যদি ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ এর যুগের প্রতিবিম্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হয় — এই শুধু, এর চেয়ে বেশি কিছু নয় — তাহলে এলিয়ট এর কাব্য সে রকম বিম্বন ঘটে — সর্বসংস্কারমুক্ত হয়ে। বিশেষ সময় চিহ্নের ছাপ তার উপর এমন জাজ্জ্বল্যমান যে তা আজ না হোক, কাল অন্তত ফিকে হয়ে যাবে।”

    রবীন্দ্রনাথের লেখার মধ্যে সমাজ বাস্তবতা ,বাস্তব পৃথিবীর রুক্ষতা,যন্ত্রণা,ক্লেদ কি খুব প্রবল ভাবে উঠে আসে ? তাঁর জাগ্রত মনের প্রবন্ধগুলোকে (যেমন – কালান্তর) যদি বাদ দিই তাহলে দেখতে পাই যে তাঁর প্রকৃত কাব্যলোকে সমাজ ও ইতিহাসচেতনা একটা নির্ধারিত সীমায় এসে তারপর মন্থর হয়ে গেছে। তিনি ধাতু প্রকৃতিতে একজন অভিজাত গীতিকবি।সত্য শিব ও সুন্দরের প্রতিই তাঁর অবিচল আস্থা। জীবনানন্দ বুঝেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথের কাছে আধুনিকতা নিছকই সমকালীন বাস্তব বা রাজনীতির ছবিকে তুলে ধরা নয় ; তাঁর দৃষ্টিতে আধুনিকতা হল চিরকালীনতা।যা শাশ্বত / চিরন্তন ও সুন্দর তিনিই তাঁরই বন্দনা করেছেন আমৃত্যু (রবীন্দ্রনাথের আধুনিক সাহিত্য , প্রাচীন সাহিত্য , সাহিত্য শীর্ষক প্রধান তিনটি সাহিত্য তত্ত্ব সংক্রান্ত গ্রন্থে যার বিশদ ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ আছে)।
যাঁরা ভাবাবেগ ও রোম্যান্টিসিজম্-কে সংহত করে কবিতার ভিতরে তীথিকের মতো তপঃশক্তি অথবা হোরেসের রীতি অথবা নিজেদের হৃদয়ের ঈষদঙ্কুরিত অন্য এক সংহতি আনতে চায় তাঁদেরও জ্ঞানত বা অজ্ঞানত রবীন্দ্রকাব্যের অনপনেয় ছায়াতেই তাঁদের স্বাবলম্বনের বিবর্তন চলেছে।

    রবীন্দ্রনাথের কবি মন বৈষ্ণবীয় ভাবরস, ঔপনিষদিক ও মানবমুখী বৌদ্ধ দর্শনে পরিপ্লাবিত হয়েছে। তাঁর আধুনিকতা নিছকই অবিশ্বাসের আধুনিকতা নয়, বিশ্বাসের আধুনিকতা। যাঁরা বলেন রবীন্দ্রনাথ আধ্যাত্মিক ও আস্তিক তাই আধুনিক বা সমকালীন পৃথিবীর রুক্ষতা,ক্ষয়,দৈন্য তাঁকে স্পর্শ করেনি জীবনানন্দ চমৎকার লিখেছেন তাঁদের উদ্দেশে যে —

“…কাব্যকে কবিমনের সততাপ্রসূত অভিজ্ঞতা ও কল্পনাপ্রতিভার সন্তান বলে স্বীকার করে নিলে, আধ্যাত্মিক সত্যে বা যে কোনো সত্যে বিশ্বাস একজন কবির পক্ষে মারাত্মক দোষ নয় — বরং শূন্যবাদের চেয়ে কাব্যসৃষ্টিকে তা ঢের বেশি জীবনীশক্তি দিতে পারে — এবং পরিশেষে রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া সভ্যতার ভিতর লালিত হলেও তার প্রতীক যে তিনি কখনোই নন — বরং আমাদের দেশে সেই সভ্যতার প্রধান ও প্রখর সমালোচক যে তিনিই, তা তাঁর জীবন ও পলিটিকস্ , তাঁর সমাজসাম্যবাদ ও সাহিত্য দীর্ঘ কাল ধরে প্রমাণ করে আসছে।”

   ‘শূন্যবাদ’-এর চেয়ে কাব্যসৃষ্টি অনেক বেশি ‘জীবনীশক্তি’-তে পরিপুষ্ট করতে পারে — রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর আধ্যাত্মিকতা শাস্ত্রাচারের অনুবর্তন নয়, কোন প্রাতিষ্ঠানিক অচলায়তনে বন্দি থাকা নয় : তাঁর অধ্যাত্মবোধ মানবমুখী।সৃষ্টিশীলতার বৈচিত্র্যে তা সমুজ্জ্বল।সময় এবং সময়োত্তরের পদচিহ্নকে তিনি ধরে রেখেছেন। তাঁর সাহিত্য পড়া মানে শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া।গোটা ইউরোপ যখন যুদ্ধে বিধ্বস্ত, সেই চরম বিপন্নতার মধ্যেও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য হয়ে উঠে ছিল শান্তির ও প্রেরণার অমোঘ আশ্রয়। ভারত সাহিত্যের সমস্ত ধারাই তাঁর সৃষ্টিতে অধিবাসিত হয়েছে। তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির আত্মার মতন।

“… আমরা অনুভব করি রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভাষা, সাহিত্য, জীবনদর্শন ও সময়ের ভিতর দিয়ে সময়ান্তরের গরিমার দিকে অগ্রসর হবার পথ যে রকম নিরঙ্কুশ ভাবে গঠন করে গেছেন পৃথিবীর আদিকালের মহাকবি ও মহাসুধীরই তা পারতেন ; ইদানীং বহুযুগ ধরে পৃথিবীর কোনো দেশই এরকম লোকোত্তর পুরুষকে ধারণ করেনি।”

     রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যের জন্ম জন্মান্তর ঘটে গেছে। তাঁকে অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই।প্রেম, প্রকৃতি, পূজা , প্রতিবাদ সবকিছুকেই তিনি মিলিয়ে দিয়েছেন।সেই সহজ, সুন্দর অতল জীবনস্রোতের নাম জীবনানন্দ। যাঁরা অনুযোগ করেন যে রবীন্দ্রনাথ অনুজ জীবনানন্দ সম্বন্ধে খানিকটা উন্নাসিকতা দেখিয়েছেন তাঁরা কি খোঁজ রাখেন জীবনানন্দের এই প্রবন্ধের ? তাঁরা জানেন না যখন জীবনানন্দের পরিণত বয়সের কাব্যগুলি যখন প্রকাশিত হচ্ছে তখন রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত ! রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা যা এখানে পরিব্যক্ত হয়েছে তা নিছকই স্তবকুসুমাঞ্জলি নয় , রবীন্দ্রনাথ‌ সম্বন্ধে সুগভীর অন্বেষণ এবং বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষিতে তাঁর গুরুত্বকে বোঝার নির্মোহ প্রচেষ্টা। জীবনানন্দের কী আশ্চর্য দূরদৃষ্টি —

“বাংলা সাহিত্য রবীন্দ্রনাথের ভিত্তি ভেঙে ফেলে কোনো সম্পূর্ণ অভিনব জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে,সাহিত্যের ইতিহাস এ রকম অজ্ঞাতকুলশীল জিনিস নয়।ইংরেজ কবিরা যেমন যুগে যুগে ফিরে শেক্সপীয়র-এর কেন্দ্রিকতার থেকে সঞ্চারিত হয়ে বৃত্ত রচনা করে ব্যাপ্ত হয়ে চলেছে আমাদের কবিরাও রবীন্দ্রনাথকে পরিক্রমা করে তাই করবে-এই ধারণা প্রত্যেক যুগসন্ধির মুখে নিতান্তই বিচারসাপেক্ষ বলে বোধ হলেও অনেককাল পর্যন্ত অমূলক বা অসঙ্গত বলে প্রমাণিত হবে না-এই আমার মনে হয়।”

৩.
“মহাবিশ্বলোকের ইশারার থেকে উৎসারিত সময়চেতনা আমার কাব্যে একটি সঙ্গতিসাধক অপরিহার্য সত্যের মতো ; কবিতা লিখবার পথে কিছু দূর অগ্রসর হয়েই এ আমি বুঝেছি, গ্রহণ করেছি।এর থেকে বিচ্যুতির কোনো মানে নেই আমার কাছে।তবে সময়চেতনার নতুন মূল্য আবিষ্কৃত হতে পারে।”

    ‘মহাবিশ্বলোকের ইশারার থেকে উৎসারিত সময়চেতনা’-কে কবি অপরিহার্য সত্য বলে গ্রহণ করেছেন আর তারই বলিষ্ঠ ছাপ পাওয়া যায় ‘সাতটি তারার তিমির’ ও ‘মহাপৃথিবী’-র মত দু’টি যুগান্তকারী কাব্যগ্রন্থে।একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক্ —

“একবার নক্ষত্রের দিকে চাই — একবার প্রান্তরের দিকে / আমি অনিমেখ। … সন্ধ্যার নক্ষত্র , তুমি বলো দেখি কোন পথে কোন ঘরে যাবো ! / কোথায় উদ্যম নাই, কোথায় আবেগ নাই, — চিন্তা স্বপ্ন ভুলে গিয়ে / শান্তি আমি পাবো ?” (নিরালোক, মহাপৃথিবী)

    জীবনানন্দ তো কখন কোন চরম সত্যকে আঁকড়ে ধরেননি।কোন আত্মতৃপ্তিও নেই তাঁর মধ্যে।যদি থাকত তাহলে তিনি জীবনানন্দ হতে পারতেন না ! প্রতিটি স্রষ্টা বা কবিরই থাকে নিজস্ব বেদনার পৃথিবী (তাঁর উপন্যাস পড়লে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।যেগুলি তাঁরই ডাইভার্সিফায়েড অটোবায়োগ্রাফি) : যা তাঁর কবিতার জগৎ। তাঁর সেই লেখাটির কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে —

“কোনো কিছুকে ‘চরম’ মনে করে সুস্থিরতা লাভ করবার চেষ্টায় আত্মতৃপ্তি নেই ; রয়েছে বিশুদ্ধ জগৎ সৃষ্টি করবার প্রয়াস — যাকে কবিজগৎ বলা যেতে পারে — নিজের শুদ্ধ নিঃশ্রেয়স মুকুরের ভিতর বাস্তবকে যা ফলিয়ে দেখাতে চায়।এতে করে বাস্তব বাস্তব ই থেকে যায় না ; দুয়ের একটা সমন্বয়ে সেতুলোক তৈরি হয়ে চলতে থাকে এক যুগ থেকে অপর যুগে — কোনো পরিনির্বাণের দিকে …।”

‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যের ‘মনোসরণি’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে —

“আর যারা মানবিক ভিত্তি গ’ড়ে — ভেঙে গেল বার-বার — / হয়তো বা প্রতিভার প্রকম্পনে — ভুল ক’রে — বধ ক’রে — প্রেমে ;— / সূর্যের স্ফটিক আলো স্তিমিত হবার আগে সৃষ্টির পারে / সেই সব বীজ আজো জন্ম পায় মৃত্তিকা অঙ্গারে। / পৃথিবীকে ধাত্রীবিদ্যা শিখায়েছে যারা বহুদিন / সেই সব আদি অ্যামিবারা আজ পরিহাসে হয়েছে বিলীন। / সূর্যসাগরতীরে তবুও জননী বলে সন্ততিরা চিনে নেবে কারে।”

    সমকালে যা সত্য তা ভবিষ্যতে সত্য নাও হতে পারে , যা চিরন্তন সত্য তা আজকের দিনে মিথ্যা হতেও পারে —

“আমিও সাময়িক ভাবে কোনো কোনো জিনিসকে ‘চরম’ মনে করে নিয়েছি জীবনের ও সাহিত্যের তাগিদে, মনকে চোখঠার দিয়ে মাঝে মাঝে — টেম্পররি সসপেনশন অব ডিজবিলিফ হিসেবে।কিংবা কখনো কখনো মনকে এই বলে বুঝিয়েছি যে, যাকে আমি শেষ সত্য বলে মনে করতে পারছি না, তা তবুও আমাদের আধুনিক ইতিহাসের দিক-নির্ণয়-সত্তা ; আজকের প্রয়োজনে চরম ছাড়া হয়তো আর কিছু নয়। কিন্তু তবুও সময় প্রসৃতির পটভূমিকায় জীবনের সম্ভাবনাকে বিচার করে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা লাভ করতে চেষ্টা করেছি। অনেকদিন ধরেই পরিপ্রেক্ষিতের আবছায়া এত কঠিন যে, এর চেয়ে বেশি কিছু আয়ত্ত করা আধুনিকদের পক্ষে অসম্ভব না হলেও কিছুটা সুদূরপরাহত।”

৪.
   বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কবি সমাজেরই একজন। তিনি এক বিরাট ঐতিহ্যের অঙ্গীভূত।তবু তিনি পথ তৈরি করে নেন নিজের মতো করে। তিনি নিজেই তৈরি করেন ঐতিহ্য।এই সমস্ত ঐতিহ্যই মিলেমিশে নির্মিত হয় ইতিহাস। তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই প্রকট বা প্রচ্ছন্নভাবে উঠে আসে সমাজের কথা,যূথবদ্ধ মানুষের কথা,কখনবা বিচ্ছিন্ন একক মানুষের কথা।তবে যা ইতিহাসকার করতে পারেন না। একজন স্রষ্টা তারচেয়েও বেশি কিছু করতে পারেন। তিনি তথ্যের কাছে এসে থেমে যান না। তিনি সন্ধান করেন সত্যের , নতুন জীবন দর্শনের।কল্পনায় তিনি সন্ধান পান নতুন দিগন্তের।

“কবির পক্ষে সমাজকে বোঝা দরকার, কবিতার অস্থি-র ভিতরে থাকবে ইতিহাসচেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান।কাল বা সময় বৈনাশিক ; কিন্তু সে সেই সমস্ত কুয়াশাগুলোকেই কেটে কেটে চলেছে যা পরিপ্রেক্ষিতের ব্যাপ্তি বাড়াবার পক্ষে অন্তরায়ের মতো।”

“পৃথিবীর সেই সব সত্য অনুসন্ধানের দিনে / বিশ্বের কারণশিল্পে অপরূপ আভার মতন / আমাদের পৃথিবীর হে আদিম ঊষাপুরুষেরা, / তোমরা দাঁড়িয়েছিলে, মনে আছে, মহাত্মার ঢের দিন আগে; / কোথাও বিজ্ঞান নেই, বেশি নেই, জ্ঞান আছে তবু; / কোথাও দর্শন নেই, বেশি নেই, তবুও নিবিড় অন্তর্ভেদী / দৃষ্টিশক্তি রয়ে গেছে : মানুষকে মানুষের কাছে / ভালো স্নিগ্ধ আন্তরিক হিত / মানুষের মতো এনে দাঁড় করাবার; / তোমাদের সে-রকম প্রেম ছিল, বহ্নি ছিল, সফলতা ছিল।” (মহাত্মা গান্ধী, বেলা অবেলা কালবেলা)

    জীবনানন্দ বিশ্বাস করতেন যে -কবিতায় আনন্দ পাওয়ার অর্থ ঠিক আশ্রয় পাওয়া নয়। কবিতায় ধর্মের মতো বিশেষত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মতো কোনো শেষ, ঈশ্বরঘন আশ্রয় নেই। কবিতা আলো দান করে, পথও দেখায় বটে, কিন্তু সে সবের চেয়ে ঢের বেশি সান্ত্বনা ও সিদ্ধি — মানুষকে বীতকাম ও অশোক করে।এই সাধনা ও সিদ্ধি একদিনে আসে না , অনেক অভ্যাসের মধ্যে দিয়ে আসে।এই প্রকৃতি, মানুষ, সমাজ, রাজনীতি ইত্যাদি একজন কবির মধ্যে উদ্দীপন হিসাবে কাজ করে —

“যে সময়ে সে (কবি) বাস করেছে, এবং যে সময়ে বাস করেনি, যে সমাজে সে কাল কাটাচ্ছে, এবং যেখানে কাটায়নি, যে ঐতিহ্যে সে আছে, এবং যেখানে সে নেই — এই সকলের কাছেই সে ঋণী। যদিও শিল্প সৃষ্টি করবার সময় এই ঋণ কঠিন উত্তমর্ণের মতন তাকে আক্রমণ করতে আসে না, এবং এই জন্যে উভয়-পক্ষেরই মঙ্গল, তবুও ঋণ-বিস্মরণের মানুষ কবি নয় ; এ জিনিস ঋণও নয়, উপায় বরং — মর্মার্থী হয়ে বেঁচে থাকবার ; — কবির অনুচেতনায় এবং কখনো-কখনো কল্পচেতনার ভিতর সঞ্চারিত থেকে তার প্রতিভাকে সাহায্য করছে তার বিশেষ অভিজ্ঞতাকে দূষিত না করেও যতদূর সম্ভব পরার্থপর করে তুলতে।”

    ইতিহাস ও সময়চেতনাকে আত্মস্থ করেই তিনি খুঁজে নিতে চেয়েছেন অনন্তের পথকে —
“হে নাবিক, হে নাবিক, কোথায় তোমার যাত্রা / সূর্যকে লক্ষ্য ক’রে শুধু ? / বেবিলন, নিনেভে, মিশর, চীন, উরের আরশি থেকে ফেঁসে / অন্য এক সমুদ্রের দিকে তুমি চ’লে যাও — দুপুরবেলায় ; / বৈশালীর থেকে বায়ু — গেৎসিমানি — আলেকজান্দ্রিয়ার / মোমের আলোকগুলো রয়েছে পেছনে প’ড়ে অমায়িক / সংকেতের মতো ; / তারাও সৈকত।তবু তৃপ্তি নেই।আরো দূর চক্রবাল হৃদয়ে / পাবার / প্রয়োজন র’য়ে গেছে —”।(নাবিক, সাতটি তারার তিমির)

৫.
    ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও অধ্যাপক তথা মনস্বী পাঠক হিসাবে জীবনানন্দ ইংরেজি কাব্য আন্দোলনের ধারাগুলির সঙ্গে সম্যক পরিচিত ছিলেন। ঔপনিবেশিক শাসনকালে ঊনবিংশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণের সময় থেকেই ইংরেজি ভাষা শিক্ষার হাত ধরেই পাশ্চাত্যের জ্ঞান বিজ্ঞান সাহিত্য দর্শনের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল।মুক্তচিন্তার একটি স্পেস তৈরি হয়েছিল।বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পরিপুষ্টির পিছনেও ছিল ইংরেজি সাহিত্যের বিরাট অত্যুজ্জ্বল ভূমিকা।এই প্রসঙ্গে অগ্রগণ্য তিনজন ব্যক্তি হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মধুসূদন দত্ত ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।এই নিয়ে আলোচনা করা এ প্রসঙ্গে অবান্তর হবে।তবে এক কথা দ্বিধাহীন ভাবে বলা যেতে পারে যে ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন ও পশ্চিমী জ্ঞান চর্চার প্রসার না হলে এক রকমের নিকষ অন্ধকারাচ্ছন্নতা ও কূপমান্ডুক্য তৈরি হত জাতীয় জীবনে। তাঁর উপলব্ধি একদম যথার্থ ও অত্যন্ত অবজেক্টিভ —

“ইংরেজি কম শিখে হিন্দী তামিল গুজরাটি বেশি শিখলে সাহিত্যিক লাভ , আমি বোধ করছি, কম হত। আমাদের সাহিত্যরচনা বেশি দেশজ (ভারতীয়) হত ঠিক, কিন্তু পরিসর তার কমে যেত ঢের ; …। বাংলা সাহিত্যে যা নেই অথবা শীর্ণ ভাবে রয়েছে সেই সব প্রাণ ও পরিসরের থেকে রশ্মি পেতে হলে ইউরোপীয় সাহিত্য ছাড়া আমাদের অন্য কোনো আলোভূমি নেই।”

    তবে ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি সাহিত্য যে গোটা বিশ্বের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছিল তা একদম ঐতিহাসিক ভাবে সত্য।ফরাসি সাহিত্যে প্রথমে সিম্বলিজম্ , সুররেয়ালিজম্ (যা এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী মতবাদ ও শিল্পান্দোলন ) এবং ডাডাইজম্-র উত্থান ঘটেছিল। কিংবদন্তি কবি শার্ল পিয়ের বোদল্যের’র রচনা গোটা পৃথিবীকে বিস্ময়াবিষ্ট করল : যেখানে উঠেছিল মানবিক অস্তিত্বের প্রতি ঘৃণা, মৃত্যু,সংশয়,ঘৃণা,ক্লান্তি, অস্থিরতা,স্ববিরোধ বিষণ্ণতা  ও সর্বোপরি আত্মবীক্ষণ।একজন বর্তমান পৃথিবীর মানুষকে আবর্তিত হতে হয় এইসবের মধ্যেই। আধুনিকতার এক নতুন অভিজ্ঞান তৈরি করেছিলেন বোদল্যের। জীবনানন্দের ভাবনাতেও কি এগুলো বারবার উঠে আসেনি নানাবিধ রূপকল্পে ? বোদল্যের মতন তো তিনিও অনেক তুচ্ছ, সাধারণ ও তথাকথিত কুৎসিতের মধ্যেও সৌন্দর্যের সারাৎসার ( উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধতা আসে) ! ফরাসি সংকেতবাদী কবি পল ভেরলেন, পল ভালেরি, আর্তুর রাবো, স্তেফান মালার্মে প্রমুখ আন্দোলিত ও রোমাঞ্চিত করেছে পৃথিবীর নান্দনিক মানসকে। তিনি লিখেছেন যে —

  “ইংরেজি কাব্য আরো প্রধান ভাবে পড়া উচিত, ইংরেজি কাব্য ফরাসীর চেয়ে সর্বদা বড় বা মহত্তর বলে নয় ( তা নয়, ফরাসী কাব্য কোনো কোনো সময় ইংলন্ডের বড় কাব্যের পথ কেটে দিয়েছে, ঢল নামিয়েছে ), বিনা অনুবাদে কবিদের নিজেদের মাতৃভাষা ও রীতিতে সে সব কাব্য পড়া সম্ভব বলে।”

     কাজেই স্বদেশি মুখ্যত বাংলা কবিতার ঐতিহ্যকে যেমন ছিল তাঁর মর্মে ও রক্তে তেমনই বিদেশি সাহিত্যের ধারাগুলিকেও তিনি আত্মস্থ করেছিলেন নতুন চিন্তার খোরাক পাবার জন্য। তাঁর স্নায়ুতটে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এই ভাবতরঙ্গ বাহিত হয়েছিল। তৈরি করেছিল তাঁর মনের জমিটিকে —

“ইংরেজি, ফরাসী কবিতার কথা বলেছি মুদ্রাদোষে নয় — হেতু আছে তাই।যে সময় ও সংস্কৃতি আমাদের জন্ম দিয়েছে তাতে ইউরোপীয় সাহিত্যের কাছ থেকে বেশি, বিশেষ আলো নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই — অন্য কোনো — এমন কি গুজরাটি হিন্দী তামিল ইত্যাদি কাব্যেও তেমন কিছু আলো আছে কিনা ভালো করে জানা নেই আমাদের।”

কীভাবে লেখা পাঠাবেন?
নীচে উল্লিখিত হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার কিংবা ইমেল আইডিতে লেখা পাঠাতে পারবেন।
হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার~ 9635459953
ইমেল আইডি~ bengalliveportzine@gmail.com
লেখার সঙ্গে নিজের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং একটি ছবি পাঠানো আবশ্যক।
ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে নিজের তোলা দুটো ছবি পাঠাতে হবে।

Related News

Leave a Reply

Back to top button