পোর্টজিন

বুদ্ধদেব বসু’র সাহিত্য-দর্শনে : মহাভারত – সুমন ব্যানার্জি

Bengal Live পোর্টজিনঃ পোর্টজিন কি? পোর্টজিন একটি অনলাইন ম্যাগাজিন। প্রতি সপ্তাহের রবিবার এটি বেঙ্গল লাইভের (bengallive.in) এর পোর্টজিন বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয়।

sunday online bengali liiterature

১. বুদ্ধদেব বসু তাঁর ”মহাভারতের কথা” শীর্ষক গ্রন্থের ‘আগুন ও জলের গল্প’ প্রবন্ধের শেষে লিখছেন যে –

“বনপর্বের পর থেকে তিনি যা কিছু করেন এবং করেন না,তা লক্ষ করলে অনেক সময় আমাদের মনে হয় যে তাঁর চিন্তাপীড়িত অস্থৈর্যের চেয়ে, তাঁর মীমাংসাহীন আত্মজিজ্ঞাসার চেয়ে অনেক ভালো অর্জুনের নিঃসংশয় যুদ্ধনীতি – বা নীতিহীনতা – অন্তত অনেক বেশি ফলপ্রদ ও প্রগতিশীল।মনে হয়, যুধিষ্ঠির যেন ইতিহাসের একটি সম্ভাবনা শুধু,আর অর্জুন ইতিহাসের স্রষ্টা।”

ধাতু প্রকৃতিতে রোম্যান্টিক কবি মানসের অধিকারী বুদ্ধদেব বসু অর্জুন প্রত্নপ্রতিমাকেই বেশি পছন্দ করেছিলেন।তিনি ইন্দ্রের ঔরস জাত : ইন্দ্র অর্থাৎ ইন্দ্রিয়, মানুষের সমস্ত কামনার উৎস।মায়িক বিশ্বের অফুরন্ত রূপ-রস-গন্ধ ও স্পর্শ’কে কানায় কানায় ভোগ করতে চেয়েছিলেন অর্জুন।বাসনা অতৃপ্ত জেনেও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এই পার্থিব ভোগ সুখকে গ্রহণ করার অকুন্ঠ ইচ্ছা এবং পাশাপাশি তাঁর অতুল পৌরুষ,রূপের ঐশ্বর্য,বীরত্ব ও পরাক্রমের অন্বয় – অর্জুন চরিত্রটিকে দিয়েছে অনন্যতা।বুদ্ধদেব কি এক নতুন ইতিহাসেরই স্রষ্টা নন ? রবীন্দ্রনাথ নামক হিমালয় প্রতিম প্রতিষ্ঠানের বিপ্রতীপে গিয়ে এক নতুন পরিসরকে সন্ধান করতে চেয়েছিলেন তিনি।প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাহিত্য জগতের অভিমুখটির সরণ ঘটে প্রেম, প্রকৃতি ও ঈশ্বর নির্ভর সাহিত্য সৃষ্টির চিরায়ত জগত থেকে।তার বদলে সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা জায়গা করে নেয়। “কল্লোল” , “কালিকলম”-র মত পত্রিকা গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে যে বাঁক বদলটি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।এই সময় যে এক দল তরুণ তুর্কি সাহিত্য জগতে আত্ম-প্রকাশ করেছিল তাঁদের মধ্যে পুরোধা স্থানীয় ছিলেন বু.ব।কিন্তু উত্তাল সমাজ বাস্তবতা নির্ভর প্রচার সর্বস্ব সাহিত্য সৃষ্টির সময়তেও যে ক’জন তরুণ ঐকান্তিক শিল্প প্রেরণাকেই নিঃশ্রেয়স বলে মনে করে ছিলেন অর্থাৎ রাজনৈতিকতার বলয় থেকে অনেকটা দূরে একান্ত শিল্প সৃজনের ভুবন নির্মাণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যেও বুদ্ধদেব বসু ছিলেন অগ্রপথিক। শিল্পায়নের মূল্যেই জীবনায়নের মূল্য তাঁর কবি দৃষ্টিতে।তীব্র রোম্যান্টিকতা, স্বপ্নালুতা, সৌন্দর্যবোধ এবং সর্বোপরি যৌনতা নিয়ে এবং তথাকথিত শালীনতা ও সুরুচি নিয়ে দুঃসাহসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা তিনি বাংলা সাহিত্যে চালিয়েছেন। তাঁর সাহিত্যে গ্রাম জীবন বা আঞ্চলিকতা আসেনি,ফুটে উঠেছে অদ্বিধ ভাবে নাগরিক জীবন। সেখানে যৌনতা ও নৈঃসঙ্গ্য বোধ কীভাবে কাজ করছে সেটা তার সৃষ্টিতে সবিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রথম-সমরোত্তর পর্বে বদলে যাওয়া নাগরিক জীবনের সমীকরণটিকে তিনি বাণীরূপ দিতে চেয়েছেন।যার উল্লেখযোগ্য তিনটি দিক হল যথা – নাগরিক নৈঃসঙ্গ্য,অনিকেত মনোবৃত্তি ও যৌনতা বা জৈব প্রেরণা;তবে নাগরিক জীবনের যৌনতার জটিল মনস্তত্ত্বকে নয়,তিনি নর-নারীর চিরপুরাতন বিরহ মিলন লীলাকেই চিত্রিত করেছেন।ঠিক এখানেই তিনি ধ্রুপদী ও রোম্যান্টিক শিল্পী।তাই তাঁকে মহাকাব্য,পুরাণ এত আকর্ষণ করেছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় বিশেষত ইংরেজি সাহিত্যে এই প্রবণতাগুলি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।ঠিক ভোগবাদ নয়, তাঁর সৌন্দর্যপিপাসু কবিসত্তা রোম্যান্টিক ভাববাদের আনন্দলোকেই মুক্তি খুঁজেছেন।

২. বুদ্ধদেব বসু তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা অনেকাংশেই পেয়েছিলেন মহাভারত ও তার ঐতিহ্য থেকে।তিনি যেন অর্জুনের মতনই আবির্ভূত হন বাংলা কাব্যাঙ্গনে।তাঁর একাধিক কবিতা ও কাব্যনাট্যে মহাকাব্যিক মিথকে বারংবার ব্যবহার করেছেন।’কাম’/’রতি’ মানব জাতি তথা জীবকুলের আদিমতম ও অনিবার্য জৈব প্রেরণা।ভারতীয় অলঙ্কার শাস্ত্রে রতিকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ‘স্থায়ীভাব’ হিসাবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে যার রস হল ‘শৃঙ্গার’।মহাভারতসহ প্রাচীন পৌরাণিক সাহিত্যে যার প্রবল উপস্থিতি লক্ষনীয়।অর্জুন ইন্দ্রের ঔরসজাত কুন্তীর গর্ভজাত সন্তান।ইন্দ্র পার্থিব ভোগৈশ্বর্যের চূড়ান্ত প্রতিভূ।পঞ্চপান্ডবের মধ্যে সেই গুণ তীব্র ভাবে সংক্রমিত।বু.ব তাঁর ”মহাভারতের কথা”-য় অর্জুন প্রসঙ্গে চমৎকার মূল্যায়ন করেছেন –

“তাঁর বহির্জীবনে অসাধারণ জঙ্গমতা থাকলেও তাঁর মন যেন নিশ্চল।…এক পরিণতিহীন চিরপ্রফুল্ল বালক যেন অর্জুন,যিনি শত্রু বলতে বোঝেন বন্য,আর বধ্য বলতে বোঝেন যে – কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে,ভোগ্য বলতে বোঝেন বসুন্ধরা ও নারী,আর কৃত্য বলতে বোঝেন অধিকার বিস্তার – যাঁর সংকল্প ও সম্পাদনায় কোনো ব্যবধান নেই, যাঁর সুন্দর আননে চিন্তার ছায়া পড়ে না কখনো,উদ্যত বাহু দ্বিধার ভারে কখনো নেমে আসে না।…”

অর্জুন দ্রৌপদীর স্বামী কিন্তু যখন ব্রাহ্মণ নিয়ে একাকী বনবাসে যান তখন আরও দু’জন নারীর প্রতি আসক্ত হন ও পরিণয় পাশে বদ্ধ হন।তাঁরা হলেন নাগকন্যা উলূপী ও মণিপুর রাজ দুহিতা চিত্রাঙ্গদা।কায়মনোবাক্যে ব্রহ্মচর্যের অস্খলিত সংযম ভেঙে চুরমার হয়ে যায় নারীর মোহমুগ্ধ রূপের কাছে।রবীন্দ্রনাথ প্রেম ও কামের স্পষ্টত ভেদ করেছিলেন যার পশ্চাতে ছিল গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম ও ভিক্টোরিয় শুচিবায়ু গ্রস্ততা।কিন্তু বুদ্ধদেব ধর্ম ও সমাজ নির্দিষ্ট শালীনতার অনুশাসনকে অতিক্রম করতে চেয়েছিলেন।কামকে বিকচমান মানবজীবনের পরিপূর্তির মূলাধার হিসাবে দেখেছেন।ঠিক এই অনুষঙ্গের তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘রজনী হল উতলা’ গল্পটির কথাও উল্লেখের দাবী রাখে।

তাঁর প্রেমের কবিতায় কীভাবে জৈবতা ফুটে উঠে হয়ে উঠেছে তীব্র সংরাগময় ও ইন্দ্রিয়াসক্ত তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক্ –

“মেয়েটি সম্পূর্ণ কিন্তু , সবেমাত্র সক্রিয় যৌবনে/কান্তিময়ী, অতি সুকুমার/অতি মৃদু আঙ্গুলে ও স্তনস্পর্শে,/অতি নম্র কটির ভঙ্গিতে … ঢেলে দেয় চুম্বনে নিমগ্ন তার ওষ্ঠাধরে।” (সন্ধিলগ্ন)

“মনে পড়ে এক রাত্রি — অমনি দাঁতের লাগে/আপেল উজ্জ্বলতর, নিঃশ্বাসে মদের পাত্র হয়ে আছে লাল,/নিঃসঙ্গ মোমের তলে অন্ধকার গাত্ররূপ গলে যায় ধীরে –/বিন্দু বিন্দু আদরে আরক্ত করো।” (মরচে পড়া পেরেকের গান)

“তুমি কাছে এলে , একটু বসলে , তারপর গেলে ওদিকে , / ইস্টেশনে গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে , তা-ই দেখতে। / গাড়ি চ’লে গেলো।… কী ভালো তোমাকে বাসি , / কেমন ক’রে বলি।” (‘চিল্কার সকাল’)

প্রকৃতি ও নারীকে নিয়ে রোম্যান্টিক মেদুরতা ও সুতীব্র সংরাগ অভিব্যক্ত হয়েছে এই কবিতায় –

” রূপোলি জল শুয়ে-শুয়ে স্বপ্ন দেখছে, সমস্ত আকাশ / নীলের স্রোতে ঝ’রে পড়ছে তার বুকের উপর / সূর্যের চুম্বনে। … এখানে জ্ব’লে উঠবে অপরূপ ইন্দ্রধনু / তোমার আর আমার রক্তের সমুদ্রকে ঘিরে / কখনো কি ভেবেছিলে ?

”দময়ন্তী” কাব্যের ‘ব্যাং’ কবিতার প্রথম দু’টি লাইনেই উত্তুঙ্গ হয়ে ধরা দিচ্ছে মানব জীবনের অক্লান্ত আদিম উল্লাসের কথা –
“আদিম উল্লাসে বাজে উন্মুক্ত কন্ঠের উচ্চসুর। / আজ কোনো ভয় নেই — বিচ্ছেদের , ক্ষুধার , মৃত্যুর।”
এই কবিতায় ব্যাং উপমিত হয়েছে একজন নিঃসঙ্গ মানুষের সঙ্গে। একজন মানুষ নিঃসঙ্গ হলেও তাঁর মন ও জীবনের ক্ষুধা তো নিঃশেষিত হয়ে যায় না – ”মধ্যরাত্রে রুদ্ধদ্বার আমরা আরামে শয্যাশায়ী / স্তব্ধ পৃথিবীতে শুধু শোনা যায় একাকী উৎসাহী / একটি অক্লান্ত সুর।”

“একদিন : চিরদিন” কাব্যের ‘এলাদি’ কবিতায় এলাদি নাম্নী একজন নারীকে কেন্দ্র করে কবির সংরক্ত জীবন-তৃষ্ণা পরিস্ফুট হয়েছে –

” আর উষ্ণ , আর সম্ভোগের আভাসে ভরপুর। / কুশান-আঁটা শিঙাপুরি বেতের চেয়ারে এলিয়ে বসেন … গাছ থেকে শুকনো পাতার মতো , তাঁর ঠোঁট থেকে একটি-দুটি / কথা যখন খ’সে পড়ে , শুধু তখন আমি তাঁর মুখের দিকে তাকাই। / চোখে চোখে পড়লে একটু হাসেন এলা-দি : লিপস্টিকে রাঙানো / ঠোঁটের ফাঁকে তাঁর দাঁতের সারি এত উজ্জ্বল যে আমি তখনই / মাথা নিচু করি … পাছে ভব্যতার সীমা পেরিয়ে যায়। / তাছাড়া আমার অন্য কথাও মনে পড়ে।”

এলাদিকে নিয়ে একরকমের সম্ভোগেচ্ছা মূর্ত হয়ে ওঠে ফুল ও ফলের ইমেজের মধ্যে দিয়ে –
” সব শ্রম , সব কষ্ট , সব দম-আটকানো / অন্ধকূপের উত্তরে এলা-দির আলস্য একটি সুন্দর / গাছের মতো ছড়িয়ে আছে , পাতায়-পাতায় অজস্র আর সবুজ, / রঙিন ফুল অনবরত ফুটে উঠেছে , কিন্তু কখনো ফল ধরে না।”

৩. বুদ্ধদেব বসুর অনন্যোপম কাব্যনাট্য “তপস্বী ও তরঙ্গিণী” নিয়ে আলোচনা করব এরপর এই প্রেক্ষিতে। মহাভারত ও রামায়ণ উভয় মহাকাব্যেই ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির কাহিনী আছে।তবে বু.ব হুবহু পৌরাণিক আখ্যানকে অনুসরণ করেননি।শিল্পসৃষ্টির প্রয়োজনেই নিজের মত করে গড়েছেন —

“এই নাটকের অনেকখানি অংশ আমর কল্পিত , এবং রচনাটি শিল্পিত অর্থাৎ , একটি পুরাণ কাহিনীকে আমি নিজের মনোমতো করে নতুন ভাবে সাজিয়ে নিয়েছি , তাতে সঞ্চার করেছিল আধুনিক মানুষের মানসতা ও দ্বন্দ্ব বেদনা। বলাবাহুল্য , এ ধরণের রচনায় অন্ধভাবে পুরাণের অনুসরণ চলে না ; কোথাও ব্যতিক্রম ঘটলে তাকে ভুল বলাটাই ভুল।আমার কল্পিত ঋষ্যশৃঙ্গ পুরাকালের অধিবাসী হয়েও মনস্তত্ত্বে আমাদেরই সমকালীন।”

কেন ‘আমাদেরই সমকালীন’ তা নিয়ে আমরা আলোচনা করব।প্রথমত, এই নাটকের মূল বিষয় নিয়ে তিনি যা যথেষ্ট তাৎপর্যমণ্ডিত –

“লোকেরা যাকে ‘কাম’ নাম দিয়ে নিন্দে ক’রে থাকে তারই প্রভাব দু-জন মানুষ পুণ্যের পথে নিষ্ক্রান্ত হ’লো”।

আমরা প্রথমেই বলেছি কামকেই জীবনের মূলাধার হিসাবে দেখতে চেয়েছেন কবি।সন্ন্যাসীর মত প্রকৃতিকে উপেক্ষা করা নয় বরং ভোগের মধ্যে দিয়েই ত্যাগের পথে যাওয়া , ব্যক্তি প্রেমের মধ্যে দিয়েই বৃহত্তর কল্যাণ ও মঙ্গলের পথ অনুসরণ করা এটাই কেন্দ্রীয় বক্তব্য।

এই পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টি প্রেরণার মূলে রয়েছে সেই কাম উর্জা।এর শক্তিও অনতিক্রম্য।কামরতি শুধু মানুষকে অনিত্যের প্রেমিক,ইন্দ্রিয় ভোগলিপ্সু করে তোলে না,শাশ্বতের জন্যেও সতৃষ্ণ করে।এই দর্শনের ওপরেই কাব্যনাট্যটি আধারিত।রাজা লোমপাদের নির্দেশে মন্ত্রী গেলেন নগরের প্রধান বারবনিতা তরঙ্গিণীকে আনতে। উদ্দেশ্য হল ঋষ্যশৃঙ্গের ধ্যানভঙ্গ করে রাজগৃহে আনয়ন এবং তাঁর সঙ্গে রাজকুমারী শান্তাকে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করা।তরঙ্গিণী তাঁর অভিষ্ট কার্যে সফল হল।এরপর রাজার নির্দেশ মত ঋষ্যশৃঙ্গ ও শান্তার বিবাহও সম্পন্ন হল।ঋষ্যশৃঙ্গ যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হল।তাঁর আগমনে রাজ্যের খরা দূরীভূত হল,ফসল শস্য সম্পদে পরিপূর্ণ হল গোটা রাজ্য।এদিকে যে পেশাদারী তরঙ্গিণীকে প্রভূত অর্থ ও সম্পদ দিয়ে নিযুক্ত করা হয়েছিল দস্তুর মত নবীন তাপসের তপস্যা ভঙ্গের জন্য সে নিজেই গভীর ভাবে প্রেমাসক্ত হল তাপসের প্রতি।অন্যদিকে চন্দ্রকেতু তরঙ্গিণীর প্রণয়াকাঙ্ক্ষী ছিল।কিন্তু চন্দ্রকেতুর আবেদনে সে সাড়া দিল না।
অন্যদিকে শান্তার প্রেমাস্পদ ছিল মন্ত্রী পুত্র অংশুমান।ঋষ্যশৃঙ্গ যখন জানতে পারল এই সত্য তখন সে বিন্দুমাত্র ক্রুদ্ধ হল না বরং পূর্ব প্রেমিকের হাতেই তাকে আনন্দের সঙ্গে সমর্পণ করল এবং যে অংশুমান তাঁকে ভন্ড বলে অমর্যাদা করেছিল সে স্বীয় ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইল।তরঙ্গিণীর মানসিক অবস্থার কথা তাঁর বৃদ্ধা মা লোলাপাঙ্গী তপস্বীকে বলেন।তখন ঋষ্যশৃঙ্গের মনে সেই পূর্বস্মৃতি ধীরে ধীরে জাগ্রত হল।এরপর তরঙ্গিণী তাঁকে বলল –

“আজ আমি পাদ্য অর্ঘ্য আনিনি,আনিনি কোনো ছলনা,কোনো অভিসন্ধি – আজ আমি শুধু নিজেকে নিয়ে এসেছি,শুধু আমি – সম্পূর্ণ,একান্ত আমি।প্রিয় আমার, তুমি আমাকে নন্দিত করো।(চতুর্থ অঙ্ক)

ঋষ্যশৃঙ্গ অকপটে ঘোষণা করল যে তাঁর ঈপ্সিতা হলেন তরঙ্গিণী।কারণ সেই তো তাঁকে নবজন্ম দিয়েছে , মানবিক জীবনবোধে উদ্বোধিত করেছে।অন্যথায় সে প্রকৃতি ও জীবনবিমুখ এক জীব হয়ে থাকত।যে জীবিত হয়েও জড়বৎ।তরঙ্গিণী সেই জড়তার কৃত্রিম আবরণ সরিয়ে এনেছে প্রাণোচ্ছ্বলতার উদ্দাম তরঙ্গ। ঋষ্যশৃঙ্গ বলল তাঁর উপলব্ধি –

“আমি জানতাম না কাকে বলে নারী,আমি যে পুরুষ তাও জানতাম না।সে আমাকে জানিয়েছিল।…সে আমার অন্তরঙ্গ।আমি ত্রাতা নই,অন্নদাতা নই, যুবরাজ নই, মহাত্মা নই – একমাত্র তারই কাছে কোনো উদ্দেশ্যসাধনের উপায় নই আমি।একমাত্র তারই কাছে আমি অনাবিল ভাবে ঋষ্যশৃঙ্গ।অতএব আমি তাকে আমার অধিকারিণী রূপে স্বীকার করি।”(চতুর্থ অঙ্ক)

কিন্তু ঋষ্যশৃঙ্গ তরঙ্গিণীকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করল না , রাজৈশ্বর্য তো অনেক আগেই সে ত্যাগ করেছে।পিতা,প্রিয় আশ্রম সব কিছুকে ছেড়ে এবং সব কিছু পেয়েও ত্যাগ করে চলে যেতে চাইল বহুদূরে।তরঙ্গিণী ব্যগ্র হয়ে যখন বলল যে –

” আমাকে তোমার সঙ্গে নাও।আমি নদী থেকে জল নিয়ে আসবো , কুড়িয়ে আনবো সমিধকাষ্ঠ , অগ্নিহোত্র অনির্বাণ রাখবো।আমি আর-কিছু চাই না , শুধু দিনান্তে একবার … একবার তোমাকে চোখে দেখতে চাই।সেই আমার তপস্যা।সেই আমার স্বর্গ।”

প্রত্যুত্তরে ঋষ্যশৃঙ্গ বললেন যে –

” হয়তো আমার সমিধকাষ্ঠে আর প্রয়োজন হবে না।অগ্নিহোত্রে আর প্রয়োজন হবে না।মেধা নয় , শাস্ত্রপাঠ নয় , অনুষ্ঠান নয় … আমাকে হতে হবে রিক্ত , ডুবতে হবে শূন্যতায়।”

তরঙ্গিণীকে সে সঙ্গে নিল না।সেও ঋষ্যশৃঙ্গকে আর অনুরোধ করল না।সেও বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইল দূরে।

বুদ্ধদেব এই কাব্যনাট্যে এনেছেন আধুনিক মানব জীবনের অনিকেত মনোবৃত্তি ও নৈঃসঙ্গ্য বোধ।যা প্রধান দুই চরিত্র ঋষ্যশৃঙ্গ অর্থাৎ তপস্বী ও তরঙ্গিণীর মধ্যে পেলাম।নারীর মোহিনী মায়ায় যে কামনায় বিজড়িত হল,সাধনা ভ্রষ্ট হয়ে সংসারী হল সেই ঋষ্যশৃঙ্গ সব শেষে ভোগ বাসনার এমনকি শাস্ত্রাচরণ থেকেও দূরে গিয়ে ডুবতে চাইল শূন্যতায়।তাঁর মধ্যে কি দেখা দিল না নতুন কোন জীবন জিজ্ঞাসা ? বু.ব যে এই চরিত্রটিকে অজানার উদ্দেশে ঠেলে দিল এর মধ্যে দিয়ে কবির নিজস্ব রোম্যান্টিক কবিসত্তার এক অভিব্যক্তি।গ্রিক মিথোলজিতে জৈব ও দিব্য এরসের কথা পাওয়া যায় এখানেও যেন তার ছায়া পড়েছে।

৪. ঠিক এই অনুষঙ্গেই আমরা আর একবার ফিরে যাব তাঁর “মহাভারতের কথা” গ্রন্থে।ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির এই ভাবনা কি আসলে মহাভারতের যুধিষ্ঠিরেরও ভাবনার সঙ্গে মিলে যায় না ? একথা বলার উদ্দেশ্য এটা নয় যে দু’টি চরিত্র সমপ্রতীতি যুক্ত।আমরা মর্মগত একটা সাদৃশ্যকে দেখতে চাইছি।

মহাভারতের শেষে আমরা কী পেলাম ? যুধিষ্ঠির সম্পূর্ণ একা। তাঁর আত্মীয় পরিজন সবাই মৃত।একটি ‘কুকুর’ তাঁর সঙ্গী হয়েছে।বৈশ্বিক পতনশীলতার মধ্যে যুধিষ্ঠির একমাত্র ঊর্ধ্বারোহী , সর্বজনীন ধ্বংসোন্মুখ জগতের মধ্যে অবিকলভাবে স্বস্থ। তিনি বেছে নেননি মোক্ষমার্গ।নিলেন না গুরুর আশ্রয়ও।কোন উপদেষ্টা ছাড়াই তিনি তাঁর পথের সন্ধান পেলেন।নিজের প্রেরণাতেই তিনি গতিশীল। বুদ্ধদেব বসু তাঁর অননুকরণীয় গদ্যে যুধিষ্ঠির সম্বন্ধে কী লিখলেন তার ভাষ্যহীন উদ্ধৃতি দেবার লোভ অসম্বরণযোগ্য –

” পুঁথিগত তথ্য হিশেবে আমরা জেনে নিলাম তিনি স্বর্গে গিয়েছিলেন ; কিন্তু আমাদের মনে এই বিশ্বাসটি অনপনেয় হ’য়ে রইলো যে দেবর্ষি ও ব্রহ্মর্ষিগণের নিত্যবাসভূমি ত্রিদিবের কোন প্রয়োজন নেই তাঁকে দিয়ে — কিন্তু প্রয়োজন আছে আমাদের , আমরা যারা মর্ত্যভূমির মরণশীল মানুষ।সব যুদ্ধ থেমে যাবার পর এবং সব আশ্রয় ভেঙে যাবার পর আমাদের জীবনে যা অবশিষ্ট থাকে , যা কেউ দান করেনি আমাদের কিন্তু আমরা নিঃসঙ্গভাবে নিভৃত চিত্তে উপার্জন করেছি — কোনো জ্ঞানের ক্ষীণ রশ্মিরেখা , অতি ধীরে গ’ড়ে-ওঠা কোনো উপলব্ধির হীরকবিন্দু , বেদনার অন্তর্নিহিত কোনো আনন্দবোধ , অবলুপ্ত প্রেম থেকে নিংড়ে-তোলা কোনো সৌন্দর্যের আভাস হয়তো — ভিন্ন-ভিন্ন মানুষের জীবনে ভিন্নরূপ নিয়ে তা দেখা দেয় …।”

 

কীভাবে লেখা পাঠাবেন?
নীচে উল্লিখিত হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার কিংবা ইমেল আইডিতে লেখা পাঠাতে পারবেন।
হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার~ 9635459953
ইমেল আইডি~ bengalliveportzine@gmail.com
লেখার সঙ্গে নিজের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং একটি ছবি পাঠানো আবশ্যক।
ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে নিজের তোলা দুটো ছবি পাঠাতে হবে।

Related News

Leave a Reply

Back to top button