Advertisement
পোর্টজিন

যাত্রা-সন্দীপ কুমার ঝা

Bengal Live Portzineঃ

যাত্রা

সন্দীপ কুমার ঝা

দশমীর সন্ধ‍্যা। আমাদের যৌথ পরিবার। শরিকী উঠোন। বড় জেঠিমার বাড়িতেই আয়োজন হত।জমাট জমায়েত। ছোট, বড়, লিলিপুট, সের, কেজি, বাটখারা সব্বাই থাকত। প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে এ ছিল এক অন‍্যরকম পারিবারিক প্রথা।

সন্ধ‍্যার পরে পরেই নতুন জামা, নতুন প‍্যান্ট। বুক পকেটে কলম। সবাই হাজির জেঠিমার উঠোনে। দুই সারিতে পাতা চট। মুখোমুখি, দীর্ঘ।অনেক লোক। লোক বলতে কেবল পুরুষ মানুষ। মধ‍্যে অনেকটা ফাঁকা জায়গা,চলাচলের জন‍্য।

চোখ ফোটার পরে জেনেছিলাম, এই প্রথার নাম — ‘যাত্রা’।

কিসের যাত্রা ? যাত্রা কেন ? কার যাত্রা ? আজও জানি না। তবে বড় হয়ে নিজের বিদ‍্যা-বুদ্ধি দিয়ে, নিজের মতো করে উত্তর বানিয়ে মনে মনে সাজিয়ে নিয়েছিলাম।

জেঠিমাই ছিলেন মূলতঃ এই কর্ম কাণ্ডের আয়োজক। লাল পেড়ে শাড়ি। জীবন্ত দুর্গা। অন‍্য গৃহবধুরাও থাকতেন সাহায্যকারিণীর ভূমিকায়।আশেপাশে, হাতে হাতে।

সেদিন সন্ধ‍্যায় বরণ ডালার মতো একটা ডালা আসত। তাতে যা যা থাকে, সব থাকত। সঙ্গে একটা সিঁদুরে গোলা বাটি, আর এক টাকার একটা কয়েন।
কয়েন দিয়ে প্রত‍্যেকের সামনে রাখা সাদা কাগজের উপরে হালখাতার দোকানির মতো ছাপ দিতে হত। সবার মাথায় ঝরত ধান,দূর্বা।

আসল কাজটা শুরু হত এর পরে।আসল কাজ মানে, লেখার কাজ।লেখা চলাকালীন কথা বলা ছিল সম্পূর্ণ নিষেধ। আমাদের মতো খুদে বাচালদের জন‍্য সে ছিল দারুন মজার আইন। মুখ টিপে চাপা হাসির হুল্লোড় ছড়িয়ে যেত। আলো হয়ে ফুটে উঠত,আমাদের আধা অন্ধকার মাটির উঠোন।

সেই কাগজের উপর লিখতে হত দেবী দুর্গা ও তাঁর সহকারীদের নাম।অনেকটা মঙ্গলকাব‍্যের ‘বন্দনা অংশে’র মত। ভুল বানান সহ নিঃশব্দে লিখে যেতাম –“ওঁ নমঃ শ্রী শ্রী দুর্গা মাতায় নমঃ, ওঁ নমঃ শ্রী শ্রী লক্ষ্মী মাতায় নমঃ..” বানানের ঝক্কিও তো কম নয়! নিজের নিজের এলেম অনুযায়ী লিখতাম।

এ পর্যন্ত সবই ঠিকঠাকই ছিল।ঝামেলা ছিল অন‍্যত্র। গ্ৰামের দ্বি-মাত্র পুজো, ব‍্যানার্জী বাড়ির।সেখানে একচালা প্রতিমার একেবারে মাথার উপরে ছোট্ট একটা শিবমূর্তি থাকত। সেটাই ছিল আমার মস্ত দুশ্চিন্তার কারণ।এই পূজোয় শিব ঠাকুর, দুর্গার সাথে আছেন বটে কিন্তু আবার নাইও! ফলে তিনি “ওঁ নম়ঃ শিবায়’ হয়ে আমার লিষ্টে আসবেন, নাকি বাতিল হবেন ? এই ছিল মস্ত চিন্তা!
বাবার কাছে রাগী মহাদেবের ‘রেপুটেশন’ শুনেছি। ফলে রিস্ক নেওয়া যেত না। শেষ পর্যন্ত ঢুকত।

কিন্তু অসুর আর মহিষ? ওনারা তো যুদ্ধ টিমের ভিতরেই! তাদের বাদ দেব ?কোন আক্কেলে ? আচ্ছা পাশের জন কী করেছে দেখি! পাশের কাগজ লণ্ঠনের আলোয় দেখা যেত না। সে চেষ্টা বৃথা।এদিকে কথা বলা যাবে না। ফলে জিজ্ঞাসাবাদও বন্ধ।
কী মুশকিল ! কী মুশকিল! তবে শেষ পর্যন্ত দানব হওয়ার অপরাধে অসুরকে, আর তাকে আশ্রয় দেবার অপরাধে মহিষকে ঐ তালিকা থেকে বাতিল বলে ঘোষনা করতাম।

শঙ্খ, উলুধ্বনি মুখর হয়ে উঠত হঠাৎ! এবার ওঠার পালা। সারি বেঁধে সকলের নিঃশব্দ পা এগোতো ব‍্যানার্জী বাড়ির মণ্ডপের দিকে। পায়ে যেন পা না ঠেকে-কড়া হুকুম। রাস্তা তখন রাস্তা নয়,যেন সার্কাসের তার। সে হাঁটাও তখন হাঁটা নয়,মজার ট্রিপল এক্সেল!

কাজ শেষ হত দুর্গা মায়ের হাতে ঐ নমঃ নমঃ লেখা চিঠিটা গুঁজে দেওয়ার পর। পরিবারের প্রধান হিসেবে কেবল,মা দুর্গার হাতেই, সে চিঠি রিসিভ করার অধিকার ছিল। চিঠি গুঁজে দিয়ে,মনে মনে বলতাম, “আবার এসো মা। সকলকে ভালো রেখো! আবার আসবে কিন্তু! তোমার অপেক্ষা করব। আর হ‍্যাঁ, আমার পরীক্ষাটা যেন ভালো হয় সেটা একটু দেখো”।

বাইরে ততক্ষণে বিসর্জনের বাজনা। “ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ রে, ঠাকুর যাবে বিসর্জন”! মনটায় হু-হু করে ঝড়ের হাওয়া বইত।সবার চোখের কোল চকচকে।

আমার টেনশন তখন ক্লাইম‍্যাক্সে!দেবী দুর্গার চালার মধ‍্যে থাকা সব দেবদেবী,মানে দুর্গা,সরস্বতী ,গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী সবাইকে প্রণাম করা শেষ হলে, সেই ভয়াবহ মানসিক চাপটা আমার সামনে এসে দাঁড়াত।

সমস‍্যাটা এই যে, অসুরটাকে প্রণাম করব কি না ? মানে,করাটা উচিত কিনা? বড্ড মুশকিলে পরতাম।চিঠিটা তো না হয় মায়ের হাতে দিয়েছি। অসুর নিজের সেই বেজ্জতিটা জানতে পারবে না। মা-ও নিশ্চয় ওকে বলবে না যে,-অসুর দেখ দেখ,ও কিন্তু তোর নামে নমঃ দেয়নি! বলবে না। নিজের ছেলেকে এই রকম ফল্স কেসে,কোনও মাই ফাঁসাবে না,সে ভরসা আছে।

কিন্তু সেটা তো চিঠির ব‍্যাপার, আর এইটা তো প্রণাম। সরাসরি। শ্রদ্ধা-অশ্রদ্ধার লাইভ টেলিকাষ্ট। এখানে অসুরকে প্রণাম না করলে তো, ওর ডাইরেক্ট বেজ্জতি! ক্ষেপে গিয়ে যদি…হাতের খাঁড়াটা…কী চকচকে রে বাবা! না না, রিস্ক নেওয়া যায় না।

মণ্ডপের এক কোণে, এমন তীব্র মানসিক দোলাচল মা নজর করত কিনা জানি না। কিন্তু অন‍্যেরা নজর করত না,এটা নিশ্চিত।

ভিড় গড়াত, অপেক্ষাও গড়াত। কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশের মাথায় বারি! শরীর জুড়ে আমার তখন অজস্র চোখ। সতর্ক! এক ফাঁকে,পিঠের আড়ালে, কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝপ্!অসুর প্রণাম কমপ্লিট! বিন্দু বিন্দু ঘাম, কপালের উপরে ততক্ষণে জলরেখা হয়ে বইছে। ইস! প্রণামটা কেউ দেখে ফেলল না তো!

হেরে যেতাম! এভাবেই হেরে যেতাম প্রতিবার! ভয়াবহ শক্তির কাছে, নিজের কাছে। আমার পরাজয়ের সেই শুরু। ভয়ের কাছে হাঁটু গেঁড়ে বসার,আমার সে এক অমোঘ জন্মকাল!

তারপর বহুকাল গ্ৰাম ছেড়েছি।পালিয়ে এসেছি দূর শহরে। সে ‘যাত্রা’-এখন সেখানে হয় না বোধহয়।এখানে দুপায়ে বাঁধা, আমার অন‍্য এক অনন্ত যাত্রা!
এখানে পায়ে পায়ে অসুর। আমি তাদের ভয় পাই। সমঝে চলি।এখানেও ভয় জিতে যায়, আমি হেরে, ঘরে ফিরি রোজ। এখন দশমী লাগেনা। রোজই অসুর প্রণাম শেষে মাথা নীচু করে উঠে দাঁড়াই। পিছনে ফিরি– কেউ দেখে ফেলল না তো!

জীবনে আজ কোথাও আর শিউলি নেই, কাশ নেই! কেবল ঐ লজ্জাটুকু তুলোর মেঘ। বাঁচিয়ে রেখেছে আমাকে!ঐ লজ্জাটুকুই আমার দুর্গা, আমার বুকের ভিতরের,শরৎকাল!

Tags
Back to top button
Close